Saturday, May 23, 2020

গল্প শেষ চিঠি

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
শেষ চিঠি
আমি মাটিতে ধূলোর মধ্যে উবু হয়ে বসে অবাক হয়ে পড়ছিলাম হাতে ধরা চিঠিদুটো। একবার নয়, দুবার পড়লাম। ছবির মতো হাতের লেখা। এসব চিঠির কথাও যেমন ভুলে গিয়েছিলাম, তেমনই ভুলে গিয়েছিলাম তার প্রেরকের কথা। আজ আবার করে সব কথা মনে পড়ে গেল।
আমাদের পুরোনো বাড়ী বিক্রি হয়ে যাবে। তাই দরকারি কোন কিছু পড়ে আছে কিনা সেটাই দেখতে এসেছিলাম এই বাড়ী। প্রায় কুড়ি বছর আগে আমরা এ বাড়ী ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাই। বছরে মাঝে - মধ্যে কয়েকদিনের জন্য বড়জোর আসি। তাও গত দুবছর তা সম্ভব হয় নি। কিন্তু আমার স্কুল- কলেজের সেই দিনগুলো এখনও যেন এ বাড়ীরই জানলা-দরজার মধ্যে আটকে আছে।
শোওয়ার ঘরের কাঁচের আলমারিটা খালি করতে গিয়ে চিঠিগুলো হাতে এলো। পৌলমীর। প্রায় পঁচিশ থেকে তিরিশ বছর আগে লেখা এই সব চিঠি। একসময়ে বারবার পড়েছি। মাথার বালিশের তলায় নিয়ে শুয়েছি। আর তাই পড়া আর না পড়া চিঠিগুলো আলাদা করতে সময় লাগল না। শেষ দুটো চিঠি দেখে অবাক হলাম।ও দুটো আমার হাতে আর পৌঁছোয়নি। প্রথমবার পড়লাম। আর পৌঁছোয়নি কেন তা লেখা পড়েই বুঝতে পারলাম।
প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। আমি তখন ক্লাস নাইনে। পরীক্ষা শেষ। যাচ্ছিলাম ট্রেনে করে মালদা। আমার মাসির বাড়ী। আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ফিরে এসেছিল আমার বাবা। কথা ছিল মালদা স্টেশনে আমার মাসি আর মেসোমশাই এসে আমাকে নিয়ে যাবেন। তা ওই ট্রেনেই আমার সঙ্গে পৌলমীর প্রথম দেখা। অবশ্য দেখা হয়েছিল সেটা বলাও বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়।
ও ছিল ওর দিদি আর বাবার সঙ্গে। ওদের বাড়ী শিলিগুড়ি। সেখানেই ফিরছিল। আমার সঙ্গে ওর বাবা আর দিদিই সেদিন কথা বলছিল। শুধু শুনেছিলাম পৌলমীও আমার মতো ক্লাস নাইনে পড়ে। কিন্তু আমার আর ওর মধ্যে কয়েকবার চোখাচোখি হলেও কথা আর হয় নি। একা যাচ্ছিলাম। যদি কোন অসুবিধে হয়, তাই আমার কাছ থেকে ওর বাবা কথায় কথায় আমার কলকাতার ঠিকানা নিয়ে রেখেছিলেন।
কলকাতায় ফেরার কিছুদিন বাদে ওর প্রথম চিঠি পেলাম। বলা যায় সেই আমাদের মধ্যে প্রথম কথা শুরু। তখন ফোন সব বাড়ীতে ছিল না। আর তাই চিঠির চল ছিল। ওই চিঠির উত্তরে আমার যে চিঠি গেল সেটা ক্লাসের পড়ার বাইরে আমার লেখা প্রথম চিঠি। খুব চিন্তা হচ্ছিল যে বানান ভূলগুলো জানিয়ে হয়ত পরের চিঠিতে এর উত্তর আসবে! ফিরতি চিঠি এলো পূজোর খবর নিয়ে। নতুন জামা, বই পড়া, পুজোর ছুটিতে বেড়ানোর প্ল্যান- তার বাইরে তেমন কিছুই ছিল না তাতে।আমি আবার লিখলাম।
এভাবেই চলল চিঠির পর চিঠি। তবে আমরা জানতাম এসব চিঠি বড়দের হাত ঘুরেই হয়ত আমাদের কাছে আসবে। তাই খানিকটা বর্ণহীণ শব্দের পোষাকে সাজিয়েই আমাদের লিখতে হত। আর এসবের মধ্যে আমি আর ও দুজনেই স্কুলের গণ্ডি পেরোলাম। আমি একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলাম। আর ও শিলিগুড়ির কাছাকাছি একটা কলেজে ইংরাজি অনার্স নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল।
চিঠি থামল না। প্রতি মাসে অন্তত দুবার। আর একটু একটু করে শব্দগুলোও সাহসী হয়ে উঠল। প্রত্যেকবারই মনে হত আরেকটু লেখার জায়গা পেলে বোধহয় ভালো হত। কত কিছুই তো জানানোর আছে। নতুন কলেজ, নতুন বন্ধু, পড়াশোনার খবর, ভালো লাগার খবর। এমন কি কেউ আছে যাকে মনের সব কথা এতো সহজে খুলে লেখা যায়!
প্রত্যেকটা দিন ঠিক যেভাবে রঙ বদলে আমার কাছে ধরা দিত, ঠিক সেভাবে ওকে খবরটা না পাঠাতে পারলে মন খারাপ হয়ে যেত। আর ওরও তাই। আর তাই ওর শহরের রাস্তা, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, এমন কি ওর পছন্দের খাবার, পোশাক সবই যেন আমার চেনা হয়ে উঠেছিল। এক অচেনা শহরের মানচিত্রে শুধুই ছিল ওর নাম।
এরই মধ্যে একটা চিঠিতে জানলাম ওর বাবা অসুস্থ। ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
কেন যেন তখনও মনে হয় নি এই চিঠির বাইরেও একটা বাস্তব জগৎ আছে। আসলে ওর পরিচয়টাই বোধহয় হারিয়ে গিয়েছিল চিঠির শব্দের মধ্যে। আর তাই ওর বাবা অসুস্থ জেনেও দেখা করার কথাটা মাথায় আসে নি। আকাশ যেমন নীল হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়, ঠিক তেমন ও যেন ধরা দিয়েছিল শুধু চিঠির মধ্যেই পেনের দাগে। ঠিক সময়ে চিঠি না পেলে মনে হত যেন বড় কিছু একটা জীবন থেকে বাদ চলে গেছে।
ওর বাবার অসুস্থতার পর থেকেই ওর কাছ থেকে চিঠি আসা কমে গেল। কয়েক মাস বাদে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। আমার বেশ কিছু চিঠির উত্তর এলো না। আমিও খানিকটা অভিমানেই আর চিঠি লেখা বন্ধ করে দিলাম। পড়াশোনার চাপও ছিল। তা ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এতো চেনামুখের মধ্যে একটা প্রায় না দেখা অচেনা মুখ কোথায় যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। সময়ের পেন্টব্রাশে আবেগ হারিয়ে গেল।
আমি তখন কলেজের তৃতীয় বছরে। সেকেন্ড সেমিস্টার চলছে। সেদিন কলেজ থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। তার পরের দিন আবার পরীক্ষা। খাওয়া শেষ করে বই নিয়ে বসতে যাবো, মা একটা বিয়ের খাম বাড়িয়ে দিল- তোর জন্য বিয়ের নিমন্ত্রণের চিঠি। পৌলমীর বিয়ে।
কিরকম লেগেছিল ঠিক বলতে পারব না। শুধু মনে হয়েছিল এর পরে আর চিঠি আসবে তো! খোলা খামের মধ্যে থেকে বিয়ের কার্ডটা বার করলাম। পরের শুক্রবারে। মধ্যমগ্রামে। ওখানেই বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। যদ্দুর জানি পৌলমীর পিসি থাকত মধ্যমগ্রামে। তাই ওখানেই হয়ত অনুষ্ঠান করছে ওরা। কলেজ ফেরত মধ্যমগ্রাম পৌঁছোতে অনেক রাত হয়ে যাবে।ঠিক করলাম, তবু যাবো।
বিয়ের দিন সকাল থেকে অঝোর বৃষ্টি। নানান রাস্তায় জল জমে গেছে। তার জন্য বাস পেতে আরও দেরি হল। যখন পৌঁছোলাম অনুষ্ঠানবাড়ী, তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। কারুর সঙ্গেই বিশেষ পরিচয় নেই। তাই চুপ করে একটু দূরে গিয়ে বসলাম। শেষে পৌলমীর দিদি আমাকে চিনতে পেরে কাছে ডেকে এনে বসালো।
কাছ থেকে বিয়ের সাজে ওকে দেখলাম। ওকে খুব সুন্দর লাগছিল। কপালে চন্দনের দাগ। বড় লাল সিঁদুরের টিপ। কপালে চুল থেকে নেমে আসা সোনার টিকলি। বড় বড় চোখের পাশ দিয়ে কাজলের টান। পরণে লাল বেনারসী। কই, ও তো কোনদিন লেখে নি যে ওকে এতো সুন্দর দেখতে! হয়ত কিরকম দেখতে তা কখনও আমরা কেউ কাউকে জানানোরও প্রয়োজন বোধ করি নি। শুধু একে অন্যের চোখে চারপাশের পৃথিবীটা দেখে গেছি।
বিয়ের মন্ত্র পড়া হচ্ছে, আর তার মধ্যেই দেখলাম আমার দিকে ও বারবার তাকাচ্ছে। শেষে আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হেসে উঠল। যেন কত দিন দেখেছে।
বিয়ের কাজ শেষ হওয়ার খানিকবাদে ও এলো। আমাকে ডেকে নিয়ে পাশের একটা ঘরে গেল। প্রথমবার ওকে এতো কাছ থেকে দেখলাম। কিন্তু তাকাতেই বুঝলাম লেখা শব্দেরা কত শক্তিশালী। আর তাই ও আমার এত চেনা। ওর হাত নাড়া, দাঁড়ানোর ভঙ্গী, কথা বলা সব কিছুই যেন আমার আগে থেকে দেখা। ওর কোন কিছুই যেন আমার অজানা নয়।
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ও বলে উঠল- কি ওভাবে তাকিয়ে আছ? কিরকম লাগছে সাজটা? সেদিন তো লজ্জায় তাকাওই নি। আজকে যে খুব সাহস হয়েছে!
খুব সুন্দর। - বলতে গিয়ে নিজেই কুণ্ঠিত অনুভব করছিলাম।
ও হেসে বলে উঠল- তোমার এই সবুজ শার্টটা তোমার ছোট মামা আগের বারের পূজোতে দিয়েছিল, তাই না? খুব ভিজে গেছো। দেখো জ্বর না আসে।
-তুমি সেটা মনে রেখেছ?
ও হেসে উঠল।বলে উঠল- অনেক কিছুই তো মনে রেখেছি। আর কেউ তো আমাকে লিখবে না যে ‘জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটায় তোমার ঠোঁটের দাগ দেখতে পাই’। আর কেউ বলবে না যে ‘মনে হয় অভিমানী বৃষ্টি হয়ে তোমাকে ছুঁয়ে মাটির খোঁজ পাই’। আরও বলি সেসব কথা? সামনা সামনি তো এসব কথা কোনদিন বলতে পারতে না, তাই না?
আমার মুখটা লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠছিল।
এর মধ্যে ঘরে একজন মহিলা ঢুকলেন। দেখে মনে হল ওর পিসি। বলে উঠলেন - কি রে সবাই তোর খোঁজ করছে, চল।
-আমি এক মিনিটে আসছি পিসি। - ও একটু ভারী গলায় বলে উঠল।
ওর পিসি চলে যেতে অস্বস্তি কাটাতে বলে উঠলাম- তোমার তো হাসির গল্প সবথেকে ভালো লাগে। তাই কয়েকটা গল্পের বই নিয়ে– বলতে গিয়ে থেমে গেলাম।
হঠাৎ মনে হল ও আমার খুব কাছে চলে এসেছে। ওর নিঃশ্বাস আমার ঠোঁট ছুয়ে গেল। প্রথমবার মনে হল ওর চোখ কিছু বলতে চায়। আমার হাতটা ধরে ও বলে উঠল -তুমি আমার শেষ চিঠিগুলো পড়েছিলে?
আমি সেদিন না জেনেই পড়েছি বলেছিলাম। আর ওর চোখদুটো জলে ভরে উঠেছিল। আমার জামার হাতাটা মুঠোয় ধরে আস্তে আস্তে ছেড়ে দিয়েছিল। সামলে নিয়ে ও বলেছিল- আমি তোমার চিঠির অপেক্ষায় ছিলাম। পাই নি। বাবার মৃত্যুর পরে আর কেউ অপেক্ষা করতে রাজি ছিল না।
আজকে জানলাম সে চিঠি আমি পড়ি নি। পাঁচ বছরে যে কথা ও আমাকে বলে নি, সেটাই ও লিখেছিল শেষ দুটো চিঠিতে। আর আমার সামনে এখন সেই চিঠিদুটোই পড়ে আছে। দু যুগ বাদে কে যেন আমাকে বলে উঠছে – তোমাকেই চাই।
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

2 comments:

  1. এক বন্ধু বলতো, ছোটগল্পের শেষ প্যারাগ্রাফ হলো শরবতের তলায় থাকা মাখনের মতো- সমস্ত স্বাদ ওখানেই| তা আপনার এই লেখাটিও ওই বাদাম শরবতের তলায় থাকা মাখনের মতো হয়েছে|

    ReplyDelete