Saturday, July 18, 2020

গল্প ঘটনার আঠাশ ঘণ্টা বাদে

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ঘটনার আঠাশ ঘণ্টা বাদে

ঘটনার চার ঘণ্টা পরে
আজকের সকালটা যে অন্যরকম তা বোঝার জন্য রেডিও চালাতে হয় নি নগেনের। ভোররাতের দিকে বাইরে হইচই শুনে ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। গতকাল অনেক রাত করে ফিরেছে। কলকাতার বাইরে কাজের ডিউটি ছিল। ভেবেছিল বেলা করে উঠবে। সকালের ডিউটি নেবে না। কিন্তু কপাল মন্দ। ঘুমের মধ্যেই বাইরে হইচই হচ্ছে শুনে তাড়াতাড়ি করে বাইরে এসে দাড়াল। বাইরে এসে যা দেখল, তাতে কিছুক্ষণ মুখে কোন কথা এলো না।
সবুজ, বেগুনী, নীল – নানান রঙের আলোয় রাতের আকাশ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। চারদিক দিনের মতো উজ্বল হয়ে উঠেছে। রাস্তার সব আলো নিভে গেছে। যেন কোন ম্যাজিশিয়ান আকাশের খোলা মঞ্চে ইচ্ছেমতো রঙের খেলা দেখাচ্ছে। অবাক হয়ে ও তাকিয়েছিল আকাশের দিকে। অনেকক্ষণ।
তার পর প্রায় চার ঘণ্টা কেটে গেছে। এখনও চারদিকে
লোডশেডিং। বাইরে এখনও অনেক লোক হতবাক হয়ে ঘোরাঘুরি করছে। চারদিকে ব্ল্যাকআউট। কেউই কিছু জানে না। শোনা যাচ্ছে ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে।
পাশের বাড়ীর মহিমদাদু কলতলায় দাঁড়িয়ে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে বলে বেড়াচ্ছে- বুঝলি, এ হল কলির শেষ। এতো অন্যায়, এতো অন্যায়। আর কতোদিন পৃথিবী সইবে বলো।শেষ সময় এসে গেছে। তা না হলে রাতের আকাশে ওরকম ভূতের আলোর নেত্য দেখতে হয়!
মহিমদাদুর ছেলে বেশ কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ। দুই নাতী- নাতনি আর বউমা নিয়ে এখন মহিমদাদুর কষ্টের সংসার। সেসব থেকেই রাগ বোধহয়।
কিন্তু এটা ঘটনা যে চারদিকে সবাই হতভম্ব হয়ে গেছে।
নগেনের দু – তিনজন কলেজপাস বন্ধু আছে। তারা যদি কিছু বলতে পারে। কিন্তু ফোন করতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল নগেন। নেটওয়ার্ক নেই।ফোন করা যাচ্ছে না। বাড়ী থেকে বেরিয়ে চেনাজানা কয়েকজনের ফোন থেকে ফোন করতে গিয়ে দেখল, তাদের ফোনেরও একই হাল। কারুরই ফোনে নেটওয়ার্ক নেই।
বাড়ী থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলে বাজার। আজ হাট বসার দিন। কিন্তু হাট আজ তেমন জমে নি। মাত্র কয়েকজন তরিতরকারি ,মাছ নিয়ে বসেছে। বাজারে স্থানে স্থানে জটলা। সবার মুখে একই আলোচনা। কি হয়েছে? কি ব্যাপার?
পার্টির দাদারাও ভ্যাবাচ্যাকা মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রামু এ পাড়ার এক উঠতি দাদা। সিগারেটের ধোঁয়া নগেনের মুখের উপরে ছেঁড়ে রামু বলে উঠল- নিউক্লিয়ার অ্যাটাক। চীন ভারতকে আক্রমণ করেছে। আর কি? আমি আগেই জানতাম। কিছু করতে পারলাম না এই যা আফশোষ রয়ে গেল।
- সে কি? আপনি কি করে জানলেন?
- আরে সেসব খবর আমাদের কাছে ঠিক চলে আসে। সব খবর তো আর তোদের দেওয়া যায় না। তবে এতো তাড়াতাড়ি ব্যপারটা যে ঘটবে তা আন্দাজ করতে পারি নি। বুঝলি, শেষ দিন এসে গেছে। কাল আর দেখব কিনা তাই সন্দেহ। তা পুজোর চাঁদাটা আজই দিয়ে দিস।– বলে হড়বড়িয়ে অন্যদিকে এগিয়ে গেল।
নগেনের এখনও বিয়ে হয় নি। ও একাই থাকে এই পাঁচমুড়ি গ্রামে। এখানে ও নতুন একটা ছোট বাড়ী করেছে। এই দুবছ্র হল। সত্যিই কি তবে আজ শেষ দিন?
যে মানুষটার জন্য পায়ের নিচে মাটি পাওয়া গেছে, শেষ দিনে তাকে না দেখলে কি করে হবে? আজকের দিনে সেই দেবতুল্য মানুষটা ঠিক আছেন তো? শুনেছে আগের বাড়ী ছেড়ে উনি এখন এক চব্বিশ তলার ফ্ল্যাটের উপরতলায় একা থাকেন। কোন বড় বিপদে পড়েন নি তো?
নগেন মুহূর্তে ঠিক করে ফেলল কলকাতায় যাবে সেই গৌতমবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। গাড়ী চালিয়ে যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগবে। আজকের এই গাড়ী- বাড়ী সবই ওনার জন্যই। না হলে নগেনের যে কি হত বলা মুস্কিল।
ওনার বাড়ীতে গাড়ী চালাত নগেন। বাবাকে খুব কম বয়সে হারায় নগেন। বাড়ীতে রোজগেরে অন্য কেউ না থাকায় মাত্র আঠেরো বছর বয়সে কাজে নেমে পড়তে বাধ্য হয়। গাড়ী চালানোর হাত ভালো ছিল না। সবে তখন শিখেছে। তবু গৌতমবাবু ওর অবস্থা দেখে ওকে ওনার দামী গাড়ী চালানোর ভার দেন। একই সঙ্গে ওনার এটা পছন্দ ছিল না যে নগেন পড়াশোনা না করে সারাজীবন শুধু গাড়ী চালিয়ে যাবে। এজন্য একটা ডিপ্লোমা কোর্সেও ভর্তি করে দেন। এমন কি মাইনে না কমিয়ে ডিউটির সময় অনেক কম করে দেন যাতে নগেন পড়াশোনা করার সময় পায়।
বলতেন – বুঝলি, ইচ্ছে থাকলে সব কিছুই করা যায়।
কয়েক বছর পড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে পড়াশোনা ওর আর হল না। ওর মাথায় ঢুকত না। বরঞ্চ ওই গাড়ীর কলকব্জার ব্যাপারটা ওর মাথায় সহজে ঢুকত। শেষে ঠিক করে নিজে গাড়ী কিনে ব্যবসা করবে। তাতেও গৌতমবাবু উৎসাহ দেন। ওকে প্রায় জোর করে টাকা দিয়ে সাহায্য করেন যাতে ও নিজে একটা গাড়ী কিনতে পারে।
সেই শুরু। কিছুদিন পরে রোজগার করে সে টাকা ফেরত দিতে গিয়েছিল নগেন। নেন নি গৌতমবাবু।
আজ উনি একা দক্ষিণ কলকাতার একটা ফ্ল্যাটে থাকেন। এই বিপদের দিনে যদি আজ নগেন না ছুটে যায় ওনার কাছে, তবে আর কবে যাবে?
গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নগেন।
ঘটনার আট ঘণ্টা বাদে
ভেবেছিল গাড়ীতে করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে। কয়েক মাইল যেতেই রাস্তায় ট্রাফিকজ্যামে আটকে পড়ল নগেন। সার দিয়ে গাড়ী পরপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। কি ব্যাপার বুঝতে গাড়ী থেকে নেমে একটু হেঁটে এগিয়ে গেল নগেন। মাইলের পর মাইল জুড়ে লাইন। পেট্রোল পাম্পে তেল দেওয়া নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। তাই নিয়ে কিছু দূরে রাস্তায় গণ্ডগোল বেঁধেছে। তেল নাকি আগামী কয়েক দিন পাওয়া যাবে না।
প্রায় সব দোকানেই বিশাল লাইন। একটা মুদীর দোকানের সামনে তো রীতিমত মারপিট চলছে। বাইরে বড় লাইন পড়ে গেছে। সবাই ঢুকতে চায়। বেশ কিছু দিনের জন্য খাবার কিনে রেখে দিতে চায় এ পরিস্থিতিতে। কি হবে কেউ জানে না! নানান খবর বাতাসে উড়ছে।
এখনও সর্বত্র ব্ল্যাক আউট। সব ট্রান্সফরমার নাকি পুড়ে গেছে। তাই রাস্তায় জায়গায় জায়গায় জটলা।
সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। তবু তার মধ্যে ধৈর্য ধরে ঢিকঢিক করে গাড়ী চালিয়ে এগোতে লাগল। অবশেষে এমন একটা জায়গা এল যেখানে গাড়ী আর প্রায় নো নড়নচড়ন। খবর নিয়ে জেনেছে ট্রেনও চলছে না। তাই সব প্রেশার এসে পড়েছে সড়কব্যবস্থার উপরে।
নাহ, গাড়ী নিয়ে আর যাওয়া যাবে না। হেঁটে আর কত সময়ই বা লাগবে! কুড়ি মাইল বাকি আর।
হেঁটে, তারপরে সুযোগ বুঝে বাসে ওঠা গেলে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে। গাড়ীটাকে রাস্তার ধারে রেখে হেঁটে এগিয়ে চলল নগেন।
এরকম অবস্থা আগে কখনও দেখে নি। লোকেরা যেন হঠাৎ করে কয়েক শো বছর পিছিয়ে পড়েছে। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই, খাবার নেই, জল নেই, কোথাও বিদ্যুৎ নেই।
একটা সময় গৌতমবাবুর অনেক আত্মীয়-বন্ধু ছিল। উত্তর কলকাতার বিশাল বাড়ীতে লোকেদের আনাগোনা সব সময় লেগে থাকত। কিন্তু আজ আর সে দিন নেই। স্ত্রী মারা গেছে বেশ কয়েক বছর। একটা সময় বিশাল ব্যবসা একা হাতে সামলেছেন। এখন ব্যবসার দায়িত্ব ভাইপোর হাতে ছেড়ে দিয়ে ব্যবসার থেকে দূরে সরে এসেছেন।
অন্যদিন সকালে উঠে বিছানার পাশে হাত বাড়িয়ে কিশোরী আমোনকারের বিভাস রাগের সিডিটা প্রথম চালান। বহুদিনের অভ্যাস। কিন্তু আজ মিউজিক সিস্টেমে গান চালু করতে গিয়ে বুঝলেন লোডশেডিং।
একই সঙ্গে বুঝলেন আজকের দিনটা যেন একটু অন্যরকম। একটা অন্যধরণের সবজে - বেগুনী আলো জানলা দিয়ে এসে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।
কিছুদিন আগে স্ট্রোকে ওনার শরীরের বাঁদিকটা প্রায় অচল হয়ে গিয়েছে। সাহায্য ছাড়া তাই ঘরে হাঁটাচলা করতে পারেন না। খুব জলতেষ্টা পেয়েছে। অন্য ঘরের থেকে জল আনাটাও ওনার কাছে আজ একটা অ্যাডভেঞ্ছার।
ওনার চব্বিশ ঘণ্টা দেখাশোনার জন্য দুজন নার্স আছে। প্রথমজন সকাল ছটা হলে চলে আসে। অন্য দিন দেরী করে না। আজ কিন্তু ছটা, সাড়ে ছটা বেজে গেল, তার আর দেখা নেই।অন্যদিকে বহুদিনের কাজের ফুলটাইম লোকটা গতকাল দু দিনের জন্য ছুটি নিয়েছে। খবর পেয়েছে বাড়ীতে মার শরীর খারাপ। আজ সকালে একজন নতুন লোক আসার কথা। তারও দেখা নেই। অবশ্য এখনও সময় আছে।
বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পরে অনেক কষ্ট করে হুইলচেয়ারে উঠে বসে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ড্রয়িংরুমে আধবোতল জল রাখা ছিল। খানিকটা জল খেয়ে হুইলচেয়ারে করে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এসেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
আকাশ জুড়ে এরকম আলোর খেলা উনি আগে দেখেন নি। যেন প্রকৃতি আবীরের রঙের খেলার মেতেছে। লক্ষ্য করলেন অনেক লোক নিচে খোলা জায়গায় ছোটাছুটি করছে। এতো উপর থেকে তাদের দেখা যায়, যোগাযোগ করা যায় না। এ যেন
এখনকার জীবনেরই একটা ছবি।
কিছু একটা যে বড় ধরণের দুর্ঘটনা হয়েছে, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। লোকে যেন ভীত সন্ত্রস্ত। আশেপাশের ফ্ল্যাট থেকে অনেক লোকের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু উনি এটাও জানেন এখান থেকে চেঁচালে ওনার ডাক কেউ শুনতে পাবে না। এমনিতেও এ ধরণের উচ্চবিত্ত ফ্ল্যাটগুলোতে কেউ কারুর সাহায্যের জন্য চট করে এগিয়ে আসে না।
কিন্তু উপায়? এ ফ্ল্যাট থেকে কারুর সাহায্য ছাড়া বেরোবেন কি করে? এখন যদি ওনার নার্স বা কাজের লোকটা না আসে! কেউ কলিং বেল বাজালে উনি রিমোট দিয়ে দরজা খুলে দিতে পারেন। কিন্তু কোথায় কে?
উনি সেলফোন বিশেষ ব্যবহার করেন না। তবু আজ সেলফোন থেকে চেনা-পরিচিতদের ফোন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু খেয়াল করলেন ফোন যাচ্ছে না। অবাক হয়ে দেখলেন ফোনের নেটওয়ারক নেই। ল্যান্ড ফোনটাও ডেড।আশ্চর্য। এরকম তো কখনও হওয়ার কথা নয়। ওনার মতো পৃথিবীরও কি শেষ সময় এসে উপস্থিত?
কি করবেন কিছু না বুঝে সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। চুপ করে হুইল চেয়ারে বসে থাকলেন রঙের খেলা দেখতে।
ঘটনার দশ ঘণ্টা বাদে
প্রথম দিকে ঘটনার আকস্মিকতা শ্রীজাতকে অবাক করে দিলেও, কি হয়েছে খবর পেতে শ্রীজাতর বেশী সময় লাগল না।
একটা বিশাল সোলার স্টরম বা সৌরঝড়। সেই সৌরঝড়ের সঙ্গে অস্বাভাবিক মাত্রায় করোনা মাস ইঞ্জেকশন অর্থাৎ চারজড সৌরকণিকা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢুকে পড়েছে। একই সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে মিলেমিশে খুব শক্তিশালী তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তার জন্যই পাওয়ার গ্রিডের সব ট্রান্সফরমারগুলো পুড়ে গেছে। একই সঙ্গে স্যাটেলাইটগুলো খারাপ করে দেওয়ায় টেলিফোনের নেটওয়ার্ক চলে গেছে।
মাথা তাই গরম শ্রীজাতর।কতদিন ধরে পারফেক্ট মারডারের প্ল্যান করেছিল।ভুল খবর দিয়ে বুড়োটার বিশ্বস্ত কাজের লোকটাকে গতকাল থেকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আজকের জন্য নতুন কাজের লোকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারপর গতকাল শেষ মুহূর্তে আসতে বারণ করে দেওয়া হয়েছিল। একদিনের জন্য নার্সের ব্যবস্থা না করে, ভেবেছিল আজকেই লঙ্কেশকে দিয়ে কাজটা সারবে।
লঙ্কেশের কাজটাও কিছু শক্ত নয়। এমন কি ধরা পড়ারও কোন ভয় নেই। ওর কাজ ছিল শুধু গৌতমবাবুর শোওয়ার ঘরটা রং করার। ঘরের রং করানোর কথা গৌতমবাবুই ক’দিন আগে শ্রীজাতকে বলেছিল। তারপরেই শ্রীজাতর মাথায় আইডিয়া আসে।
রংমিস্ত্রি লঙ্কেশের পক্ষেও জানা থাকার কথা নয় যে ও যে নীল রঙ ব্যবহার করবে তাতে অনেক বেশী মাত্রায় সায়ানাইড আছে। এই নীল রঙের পেন্টে এমনিতেই সায়ানাইড থাকে। এটাতে আরেকটু বেশী ছিল আর কি! এ ব্যাপারে শ্রীজাতর নিজের অভিজ্ঞতা আছে। এক সময়ে রঙ তৈরির ব্যবসা ও করেছে। একই সঙ্গে জানা আছে যে বুড়োটা সবসময় ঘরের জানলা - দরজা বন্ধ করে শোয়। দীর্ঘ দিনের অভ্যেস।
সবই ঠিক ছিল। শুধু বাড়তি সাবধানতার জন্য লঙ্কেশকে আগে থেকে জানানো হয় নি কোথায় রং করতে হবে। অ্যাড্রেসও ইচ্ছে করে আগে থেকে জানায় নি লঙ্কেশকে। কিছুদিন আগে লঙ্কেশকে দিয়ে নিজের বাড়ী রং করানোর সময় প্ল্যানটা মাথায় আসে। নিজের বাড়ীর কাজ এখনও শেষ হয় নি। কিনে আনা রঙের সঙ্গে বিশেষ মাত্রায় সায়ানাইড মিশিয়ে এই স্পেশাল রং নিজের হাতে তৈরি করেছে। সেটা লঙ্কেশের কাছে গতকাল দিয়ে এসেছে। ঘরে রং করে দরজা বন্ধ করে শুলেই ব্যাস। রং থেকে নিষ্কৃত সায়ানাইড গ্যাসে এক ঘণ্টায় কাজ সারা হয়ে যাবে।
কখন কোথায় কাজটা করতে হবে সেটা সকালবেলা ফোন করে জানানোর কথা ছিল। শুধু বলা ছিল আজকেই কাজটা সারতে হবে। আরজেন্ট। যে করে হোক আজকেই করতে হবে। অন্য কোন কাজে লঙ্কেশ যেন হাত না দেয়। কিন্তু সে জানানোর উপায় এখন আর নেই। একমাত্র উপায় গাড়ী নিয়ে লঙ্কেশের বাড়ী গিয়ে জানিয়ে আসা।
এতো দিনের প্ল্যান নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে মাথা প্রথমে বেশ গরম হয়ে গিয়েছিল।
কিছুদিন বাদে গৌতমবাবুর বন্ধু প্রশান্তবাবু ফিরে এলেই উইল পরিবর্তন হয়ে যাবে।
এই মশলাপাতি- চাল এক্সপোর্টের ব্যবসা গৌতমবাবুই শুরু করেন। গৌতমবাবু সম্পর্কে শ্রীজাতর জ্যেঠা হন। গৌতমবাবু ভাইকে অর্থাৎ শ্রীজাতর বাবাকে অর্ধেক সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। কিন্তু ওনার অংশ যদি চ্যারিটিতে দান করে দেন, তাহলে অর্ধেক সম্পত্তি শ্রীজাতর হাতছাড়া হয়ে যাবে। শ্রীজাতর পুরোটা চাই। পুরোটা।
মাথা ঠাণ্ডা করে আরেকবার ভাবল শ্রীজাত।
আচ্ছা, এ পরিস্থিতিতে সেরকম কিছু ব্যস্ততার কোন দরকার আছে কি? এমনিতেও ওই রকম একটা ফ্ল্যাটে একটা মানুষ কতক্ষণ টিঁকে থাকতে পারবে? মনে তো হয় না কাউকে সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারবে। এমনিতেও ওই কমপ্লেক্সে গৌতমবাবুর পরিচিত কেউ নেই যে ওনার কথা খেয়াল রাখবে। আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে আসবে।
ধীরে সুস্থে আজকেই না হয় অন্য যে কোন সময়ে লঙ্কেশকে দিয়ে রঙের কাজটা সারানো যাবে।কাল নার্স এসে গৌতমবাবুর মৃতদেহ আবিষ্কার করবে। এতো কিছুর মধ্যে পুলিসের পক্ষে এ বিষয়ে তদন্ত করাও সম্ভব হবে না। শেষ এরকম বড়সড় সৌর ঝড়ের ঘটনা ঘটেছিল ১৮৫৯ সালে। যাকে বলা হয় ক্যারিংটন ইভেন্ট। তখন এভাবে টেকনোলজি মানুষের ঘাড়ের উপর চেপে বসে নি।না ছিল জিপিএস, না ছিলও সেলফোন, না ছিল ইলেক্ট্রিসিটি। শুধু সেসময় টেলিগ্রাফ সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এখন শুধু একদিনে কত যে লুটপাটের ঘটনা ঘটবে তার কি কোন ইয়ত্তা আছে! পুলিস সেটা সামলাবে, না এরকম একটা আপাত দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে লোক লাগাবে। তা ছাড়া এ ভাবে অপরাধীকে ধরার জন্য যে দক্ষতা লাগে, সে দক্ষতা যে কলকাতা পুলিসের নেই – সে ব্যপারে শ্রীজাত নিশ্চিত।
আর ধরবেই বা কাকে? ওই রঙের কোম্পানীর মালিককে যার রঙে ও সায়ানাইড মিশিয়েছে। নিজের মনে হেসে উঠল শ্রীজাত।
আপাতত ওর একটাই কাজ। লঙ্কেশকে খুঁজে বার করা।
ঘটনার ১৬ ঘণ্টা বাদে
এই এতক্ষণে একটা বেলের আওয়াজ যেন পেলেন গৌতমবাবু। ঠিক শুনেছেন কি? এরকম আগেও যেন দুবার শুনেছেন। দরজার কাছে গিয়ে কাউকে দেখতে পান নি। অথচ অন্য কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই। বাইরে অনেক কষ্টে বেরিয়ে একবার দরজা খুলে গিয়ে দেখেছেন লিফট কাজ করছে না। পাশে শর্মার ফ্ল্যাট। কিন্তু সেখানেও কেউ নেই। যাবেন কোথায়?
সকাল থেকে প্রায় কিছুই খাওয়া হয় নি। তাই শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। জলতেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। কোনও কলে জল নেই।
তবু আস্তে আস্তে হুইল চেয়ার নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন- কে? কে?
- আমি নগেন। আপনার গাড়ী চালাতাম। মনে পড়ে কাকু?
ছেলেটার গলা চেনা চেনা লাগছে। আচ্ছা, নগেন। কত বছর আগে ছেলেটা গাড়ী চালাত। অনেক কষ্ট-করশত করে বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে কোন রকমে দরজা খুলে দিলেন গৌতমবাবু।
কিন্তু খুলেই পড়ে যাচ্ছিলেন। নগেন ঘরে ঢুকেই গৌতমবাবুকে জড়িয়ে ধরে কোনরকমে সামলে নিল। তারপরে ওনাকে ধরে সোফায় এনে বসাল নগেন।ও নিজেও ক্লান্ত হয়ে গেছে। লিফট কাজ করছে না। চব্বিশ তলা হেঁটে উঠেছে। তার আগে কুড়ি মাইল পথ হেঁটে এসেছে।
এ ফ্ল্যাটে আগে কখনও আসে নি নগেন। চারদিকে বৈভবের চিনহ। কিন্তু কোথায় যেন তবু শূন্যতা ছড়িয়ে আছে।
বাইরে যে কি তান্ডব চলছে, ঘরের মধ্যে থেকে তা এখনও বুঝতে পারেন নি গৌতমবাবু। সব পাম্প থেমে যাওয়ায় কোথাও পানীয় জলও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কষ্ট করে জল জোগাড় করেছে নগেন। একটা দোকান থেকে অনেক কষ্ট করে সামান্য খাবারও নিয়ে এসেছে।
অশক্ত হাতে খানিকটা জল আর খাবার খেয়ে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে তবে কথা বললেন গৌতমবাবু।
- নেহাৎই খুব খিদে পেয়েছিল, তাই খেলাম। তা না হলে খেতাম না। এতো দিন আসিস নি কেন হতভাগা?- অভিমানী গলায় বলে উঠলেন গৌতমবাবু।
মাথা নীচু করে নগেন বলে উঠল- খুব ভুল হয়ে গেছে। একদিন এসেছিলাম। কিন্তু গেট থেকে ঢুকতে দেয় নি। আপনার ফোন নাম্বার আমার কাছে ছিল না। আপনি বাড়ীতে নেই বলে জানিয়েছিল সিকিউরিটি। তাই ফিরে গিয়েছিলাম। ভয়ে আর আসি নি। এখানকার যা ব্যাপার স্যাপার।
-তা তোর গাড়ী কিরকম চলছে? রোজগার হচ্ছে?
-হ্যা, চলে যাচ্ছে। একা থাকি। ভালোই চলে যায়।
-খুব ভালো। তা তোর কোন সাহায্য লাগবে?
-না, না, আগের টাকাই তো আপনি ফেরৎ নিলেন না। আমার বেশ চলে যাচ্ছে। কোন কিছু লাগবে না।
-আমাকে একটু বাইরের বারান্দায় নিয়ে চল তো।
হুইলচেয়ার ঠেলে গৌতমবাবুকে আবার বাইরে বারান্দায় নিয়ে এল নগেন।
এখন সন্ধে হয়ে গেছে। অন্যদিনের মতো কমপ্লেক্স আজ আলোয় ঝলমল করছে না। পুরো শহরের মতো কমপ্লেক্স এখনও অন্ধকারে ঢেকে আছে।
-এরা জেনারেটর চালায় নি কেন সারাদিন জানি না!
-ওটাও শুনলাম নাকি পাওয়ার সারজে পুড়ে গেছে।
-বেশ হয়েছে। পাশে বস।
নগেন পাশে একটা চেয়ার টেনে এনে বসে।
নগেনের মাথায় হাত দিয়ে গৌতমবাবু বলে উঠলেন- বুঝলি এতো অন্ধকার না হলে আলো দেখা যায় না। তাই তো আজ তোকে আবার দেখতে পেলাম। নইলে যখন চারদিক আলোয় ঝলমল করে তখন মানুষের দেখা পাই না। - একটু থেমে ফের বলে উঠলেন- মাঝে মধ্যে এখানে আসিস। তা এরকম কতদিন চলবে কিছু শুনলি?
-কেউ এখনও কিছুই জানে না। অনেককে জিজ্ঞেস করলাম। শুনলাম সূর্য নাকি ক্ষেপে গেছে। কবে শান্ত হবে কে জানে? যতদিন সব স্বাভাবিক হচ্ছে, আমি কিন্তু আপনাকে রেখে এখান থেকে যাচ্ছি না। আপনার কাজের লোক গণেশ এখন নেই? কাউকে তো দেখলাম না!
-গতকাল দু দিনের জন্য বাড়ীতে গিয়েছিল। কাল ফিরে আসার কথা।
- আপনার শরীর কিন্তু একদম ভেঙ্গে গেছে। আগে কত ভালো স্বাস্থ্য ছিল।
কথা বলতে থাকে নগেন। গৌতমবাবু মনে মনে হাসতে থাকেন। এই প্রিয় ছেলেটাকে যখন ড্রাইভার হিসেবে পেয়েছিলেন, তখন ওর বয়স সতেরো কি আঠেরো ছিল। কিন্তু তখনই ওর মধ্যে যে নিঃস্বার্থ সরল চরিত্র দেখেছিলেন, সেটা এখনও রয়ে গেছে। এক যুগ পরেও ছেলেটার অনর্গল কথা বলার অভ্যেসটাও যায় নি। একই সঙ্গে এই কম্পিটিশন আর চালাকির যুগে যে এই বোকাসোকা ছেলেটা টিঁকে আছে, সেটা দেখে উনি নিশ্চিন্ত বোধ করলেন।
মুস্কিল হল যাদের উনি অনেক কিছু দিয়ে যেতে চান, তারাই যে কিছু চায় না। জোর করে দিতে হয়।
ঘটনার আঠাশ ঘণ্টা বাদে
মাঝ রাতে শ্রীজাত যখন ফিরল, তখন ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। সারাদিন লঙ্কেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে নি। ফোন নেটওয়ার্ক এখনও অচল। এখনও ব্ল্যাক আউট চারদিকে। পাওয়ার গ্রিডে যেরকম ক্ষতি হয়েছে, তাতে অবস্থা স্বাভাবিক হতে এখনও বেশ কিছু দিন লেগে যাবে। নেহাৎ বাড়ীতে জেনারেটর আছে, তাই বাঁচোয়া।
শ্রীজাতর উপরমহলে ভালো জানাশোনা আছে। মশলাপাতির ব্যবসা শুধু শুধু রমরমিয়ে চলছে না। ইতিমধ্যেই আগামী দু মাসের জন্য বেশ কিছু খাবার কিনে মজুত করে রেখেছে।বাইরে মার্কেটে অল রেডি বিভিন্ন দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার আউট অফ স্টক। এখন যে ক’দিন যাবে, সংকট আরও বাড়বে, শ্রীজাতর মতো লোকেদের ফায়দা আর বাড়বে। পেট্রোল ডিজেল ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে না। পাইপলাইনে এর জন্য একটা বড়োসড়ো আগুন লেগে গেছে। যে সব পাইপের মাধ্যমে এসব জ্বালানী আসত, তা নাকি তাই আসা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সব জিনিষের দাম আরও চড়চড় করে বাড়বে। পরিবহণ ব্যবস্থা প্রায় অচল।
রাস্তাতে অনেক জায়গায় গুণ্ডামি, লুঠের খবর পাওয়া গেছে।
আজ আঠেরোটা বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে সারা বিশ্বে, তার মধ্যে একটা দিল্লীতে। আসলে বিমান বন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার বেশ খানিকক্ষণ কাজ করছিল না। জাপানে, আর জার্মানিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেন চেঞ্জ করতে না পারার জন্য বেশ কয়েকটা ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। রাশিয়ায় একটা তৈল শোধনাগারে এর জন্য বড়সড় দুরঘটনায় হাজার হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে।
অবশ্য এখনও অনেক খবর পাওয়াই যায় নি। সবে আসতে শুরু করেছে। নেহাত কিছু টিভি আর রেডিও চ্যানেল এখন কাজ করতে শুরু করছে, তাই কিছু কিছু খবর এখন পাওয়া যাচ্ছে।
সবকিছুর উপরে একটা জগৎ আছে, যেখানে টাকা আর ক্ষমতা থাকলে ভয় পেতে হয় না। শ্রীজাত সেই জগতের লোক। তাই ও ঘাবড়ায় না। বরং এতে শ্রীজাতর অনেক সুবিধা। ওর নিজের ব্যবসা আগামী ক’দিনে যে ফুলে ফেঁপে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু একটাই খারাপ খবর তা হল বুড়োটা নাকি এখনও বহাল তবিয়তে আছে। এরকমই খবর পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ প্ল্যান A টা এখনও বহাল রাখতে হবে। এসব কথা ভেবেই বন্ধুদের সঙ্গে একটু বেশী মদ্যপান করে ফিরেছে শ্রীজাত।
সোজা শোওয়ার ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পারল। আজ এসি চলবে না। জেনারেটরে শুধু আলো- পাখার ব্যবস্থা আছে। পাখা চালিয়ে শুয়ে পড়ল।
চাকর এসে জানাল লঙ্কেশ নাকি বাড়ীতে খোঁজ নিতে এসেছিল। তার নাকি কি একটা দরকারী রঙের কাজ ছিল, কিন্তু সে ব্যাপারে বাবুকে নাকি সারাদিন যোগাযোগ করতে পারে নি।
এই হল ফোনহীন জগত। দুজন দুজনকে খুঁজে বেরিয়েছে সারাদিন। যোগাযোগ করতে পারে নি।
আজকের মতো কাজ সারার ভালো দিন আর ছিল না। আবার আরেকটা দিনের অপেক্ষা।
-বাবু, জানলা খুলে দেব?
-কোনদিন আমি জানলা খুলে শুই- বেরো ইডিয়ট।
আরও কি বলতে যাচ্ছিল চাকরটা। ধমক দিয়ে বার করে দিল শ্রীজাত। এটা একটা বলার সময়! রাত একটা বাজে। নেশা কেটে যাচ্ছে।
বিছানায় শোয়ার খানিকক্ষণের মধ্যে বেঁহুশ হয়ে ঘুমোতে শুরু করে দিল। রাতের দিকে মিষ্টি একটা গন্ধ পেল। অ্যালমন্ডের। ভারী হাল্কা সে গন্ধ। গভীর, আরও গভীর ঘুমে হারিয়ে গেল শ্রীজাত।
চাকরের শেষ কথাটা ওর আর শোনা হয়ে ওঠে নি। লঙ্কেশ কোথায় রঙ করতে হবে জানতে এসেছিল। এ ঘরের রং খানিকটা বাকি ছিল। বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে এ ঘরেই ওই রঙ করে বিকেলের দিকে লঙ্কেশ বেরিয়ে গেছে। কাজটা আজকেই শেষ করার কথা ছিল যে!
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
১২- ডিসেম্বর- ২০১৭

Friday, June 19, 2020

সীমান্তে


সীমান্তে 

খড়গপুর স্টেশনে নেমে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলাম। যেতে হবে কেশিয়ারী। বাস এলো ঘণ্টাখানেক বাদে। খুব ভীড় কোনরকমে পাদানিতে পা দিতে না দিতেই বাস ছেড়ে দিল।

আধঘণ্টার পথ। কিন্তু  পথ যেন আর শেষ হয় না। কেশিয়ারীতে যখন পৌঁছলাম, তখন চারপাশের গাছ-গাছালির উপরে শেষ বিকেলের আলোর রঙ ছড়িয়ে পড়েছেঘরমুখো পাখির ঝাঁকে আকাশ ঢাকা পড়েছে। বাসস্ট্যান্ড প্রায় ফাঁকা। দূরে পান্নাদার চায়ের দোকানে দুজন বেঞ্চিতে বসে আয়েস করে চা খাচ্ছে। কোন তাড়া নেই। আমারও সেরকম হলে বেশ হত। কিন্তু নাআমার পক্ষে তো আর তা সম্ভব নয়। ভারতীয় সেনার জন্মু আর কাশ্মীর রাইফেল রেজিমেন্টের সেনা আমি। প্রত্যেক মুহূর্ত হিসেব করে চলতে হয়। প্রত্যেক মুহূর্তে সতর্ক পথ পেরিয়ে এগিয়ে যাই জীবন- মৃত্যুর সীমান্ত ধরে।

 বাসস্ট্যান্ডে কোন ভ্যান-রিকশা ছিল না। অপেক্ষা না করে হাঁটতে শুরু করলাম। এখান থেকে  মাইল পাচেঁক  হাঁটা। কিন্তু আমার সে অভ্যেস আছে। তাও তো আজ আমি খালি হাতে হাঁটছি। কতদিন কত  ভারী জিনিষ পিঠে নিয়ে পাহাড়ি পথে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতে হয়েছে

অনেকদিন বাদে আমার গ্রামে ফিরে এলাম। এখানেই ছোটবেলা থেকে থেকেছি। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেছি। তার পর গত দশ বছর বাড়ী থেকে দূরে। মাঝে মধ্যে দিনকয়েকের জন্য এসেছি। ছুটিও পাই নি তেমন। আর তাই যখনই এই গ্রামে আসি মনে হয়, এ গ্রামের অ্যালবামে আমার ছোটবেলার ছবিই শুধু যেন রয়ে গেছে। 

পানাপুকুর পেরিয়ে, ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কত কথা মনে পড়লআমি আর ব্রতীপ্রথম আলাপ খড়গপুরে। বছর তিনেক আগের কথা। আমি তখন দিল্লি থেকে বাড়ী ফিরছি ছুটিতেস্টেশনে নামতেই খেয়াল করলাম এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক সামনের বেঞ্চিতে বসে আছে। আর তার পাশে বসা এক কমবয়েসী মেয়ে তাকে জল খাওয়াচ্ছে। এমনিতে হয়ত খেয়াল করতাম না। কিন্তু দেখেই মনে হল ভদ্রলোকের শরীর বেশ খারাপ। এগিয়ে গেলাম। আর কাছে যেতেই চিনতে পারলাম। আমাদের বাংলা পড়াতেন। মানিকবাবু। কিন্তু একি চেহারা হয়েছে! পাশের মেয়েটা ওনার মেয়ে। জিজ্ঞেস করলাম – কি হয়েছে?

মেয়েটা উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল- বাবাকে নিয়ে কলকাতায় যাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন হঠাৎ করে এতো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন যে কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

আমার পরিচয় দিয়ে বলে উঠলাম – কিসের অসুস্থতা?

-কিডনীর অসুখ। তাই কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাছিলাম। কিন্তু এখন যা অবস্থা তাতে তো আর নিয়ে যাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না বাড়ীতে আর কেউ নেইতাই আমাকেই আসতে হয়েছে।
বুঝতে পারলাম ওদের অসহায় অবস্থার কথা। সেনা হিসেবে একজন সাধারণ নাগরিকের বিপদের মুহূর্তে তাকে তো আর ফেলে আসা যায় না। তাই ঠিক করলাম বাড়ী যাওয়ার যতই তাড়া থাকুক না কেন, ওনার কিছু একটা ব্যবস্থা না করে যাবো না।

মানিকবাবুকে দেখলাম ক্রমশ বেঞ্চির উপরে এলিয়ে পড়ছেন। ওদের বসতে বলে ব্যাগ রেখে আমি ছুটলাম ডাক্তার খুঁজতেস্টেশনের পাশেই এক ডাক্তারের চেম্বার ছিল। অনেক কষ্ট করে ওনাকে ধরে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ মতো কিছু ওষুধ কিনে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে এলাম ওদের।

বাড়ী থেকে বেরোনোর সময় ওর নাম জানলাম। ব্রতী। তা এভাবেই ওর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তার পরে কিছুদিন যেতে না যেতে আমরা একে অপরের আরও কাছে এলাম। বন্ধুত্ব বাড়ল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে দূরত্ব কমল। গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠল যেখানেই থাকি না কেন ওর সঙ্গে ফোনে কথা না বললে দিনটা যেন অসমাপ্ত থেকে যেত। কেউ যেন ঘড়ির ঘণ্টা আর মিনিটের কাঁটাটা বাদ দিয়ে দিত ওর সঙ্গে কথা বলার সময়। কয়েক মাস পরে ওর বাবা মারা গেলেন।খুব কেঁদেছিল সেদিন।আমি সেদিনও দূরে ছিলাম। ভারত –পাক সীমান্ত তখন উত্তাল। তাই যেতে পারি নি।

ওর বাবা নেই, মাও ছোটবেলায় মারা গেছেন। ওকে তাই ওর মামাবাড়িতে গিয়ে উঠতে হল। আমি বাড়ীতে ওর কথা জানিয়েছিলাম। দুই পরিবারের মধ্যে আমাদের বিয়ের কথা এগোল। দুমাস বাদে গত বছর  নভেম্বারে বিয়ে ঠিক হলদিনক্ষণ সব ঠিক।ঠিক হল বিয়ের দুদিন  আগে আমি গ্রামে ফিরে আসব।  

কিন্তু না, ফিরে আসতে পারি নি। শেষ মুহূর্তে হঠাৎ আটকে গেলাম। সীমান্ত আবার চঞ্ছল হয়ে উঠেছিল। পুনচের লাইন অফ কন্ট্রোল পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা ভারতে ঢোকার চেষ্টা করছিল। একটা পাকমদতপুষ্ট টেররিস্ট গ্রুপ বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসবাদীকে ভারতে পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল। বাধ্য হয়ে শেষ মুহূর্তে বিয়ের দিন পরিবর্তন করতে হল।

আমি জানি সেজন্য ব্রতী আমাকে ক্ষমা করে নি। করা উচিতও নয়। এতো আর আমেরিকা নয়। ওর মধ্যে আমার যে  চিনহ রেখে এসেছিলাম, তাকে সমাজ কি এতো সহজে স্বীকার করে নেবে! তাও আবার এইরকম গ্রামের সমাজ। যেখানে আজও হাজার কুসংস্কার আছে।

এর মধ্যে শুধু ফোনে কথা হয়েছে। আমি অবশ্য যেসব জায়গায় যাই, তার বেশীর ভাগ জায়গায় নেটওয়ার্কও থাকে না। সব জায়গা থেকে সিকিউরিটির কারণে ফোন চাইলেও করা যায় না। তবু প্রত্যেক সপ্তাহে অনেক পথ পেরিয়ে গেছি শুধু ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার জন্য। ওর অভিমানী গলা শুনেছি। কিন্তু আমার তো আর কিছুই করার ছিল না

এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন জানি আমার গ্রামের বাড়ীর কাছে চলে এসেছি। দূরে এতক্ষণে কিছু বাড়ীতে আলো জ্বলে উঠছে। সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে। হঠাৎ করে এক রাশ মেঘ এসে দিনের শেষ আলোটুকু চুরি করে নিয়েছেকখন ভারী বৃষ্টি নামবে কে জানে! আমি দ্রুতপায়ে এগিয়ে চললাম।
 আজকে বিশেষ দিন। আমি কথা দিয়েছিলাম আজকে যে করেই হোক ব্রতীর সঙ্গে থাকব। তাই তো এসেছি এতোটা পথ পেরিয়ে। বাড়ী না গিয়ে সোজা হাসপাতালের পথ ধরলাম। এখানেই আছে ব্রতী।  জানি সমাজের সব বাধা নিষেধ অগ্রাহ্য করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ওর পক্ষে এত সহজ  ছিল না। আর আমার বাড়ীর থেকেও ওই দিনের পরে আর কেউ ওকে স্বীকার করতে চায় নি। নাহ, সে কথা আজ থাক। ভাগ্যে যা থাকে, তাই হয়।  আমরা প্রশ্ন করতে পারি। কিন্তু উত্তর খুঁজে পাব না।

হাসপাতালে যখন পৌঁছলাম তখন ভিসিটিং আওয়ারস শেষ। মেঘ সরিয়ে একফালি চাঁদ ফের উঁকি দিচ্ছে। ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছে। শীতের অন্ধকার যেন কুয়াশার চাদরের আড়ালে বাড়ীটাকে কিডন্যাপ করেছে। আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। নিচে সিঁড়ির কাছে দুজন নার্স বসে গল্প করছে। একটা পাহারাদার গোছের লোক সিঁড়ির প্রথম ধাপে বসে খৈনি খাচ্ছে। তার দুটো সিঁড়ি উপরে একটা নেড়িকুকুর বারান্দায় লেজ গুটিয়ে বসে আছে। আমি ওদের পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে গেলাম।

দোতলার বারান্দায় পরপর ঘর। ব্রতীকে খুঁজে বার করতে সময় লাগল না। ও শুয়ে আছে। চুল উস্কোখুস্কো। মুখে অস্ফুটে কি যেন বলছে! একা।  পাশে কেউ নেই। কে বা থাকবে বাপ- মা মরা অভাগা মেয়েটার পাশে। বিশেষ করে যাকে সমাজও স্বীকার করে না।

-না, ব্রতী তুমি চোখ বুজে শুয়ে থাক। আমি আছি তোমার পাশে। যেমন কথা দিয়েছিলাম যে সব সময় তোমার সঙ্গে থাকব সুখে দুঃখে। আমি জানি তুমি ভেবেছিলে হয়ত আমি আর আসব না। তা কখনও হয়! এরকম বিশেষ মুহূর্তে আমি আসব না! আমি আমার সন্তান দেখতে আসব না?
মনে আছে আমরা এক সঙ্গে গাইতাম- ‘জীবন – মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে’? আজকে খুব সে কথা মনে হচ্ছে। সে গানের কথাগুলো যেন প্রাণ পেয়ে আমার আর তোমার মধ্যে এই নীরব রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়েছে।

চুপ করে পাশের টুলে বসে অপেক্ষা করলাম। রাত বাড়ছে। যন্ত্রণায় ও ছটফট করতে শুরু করল। ওর চিৎকার শুনে একজন নার্স ছুটে এসেছে। ডাক্তার, হ্যা ডাক্তার ডাকার এক্ষুনি দরকার। হয়ত সময় হয়ে এসেছে। আমাদের সন্তানের আসার।  হাসপাতালের রেসিডেণ্ট ডাক্তার ছুটে এলো খানিকক্ষণের মধ্যেই। ওকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হল। আমার সেখানে যাওয়ার সাহস নেই। চুপ করে দরজার বাইরে অপেক্ষায় বসে থাকলাম।  প্রসবযন্ত্রণায় ও  বারবার চিৎকার করে উঠছে। নার্সটা ভালো। ওর চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিছু একটা ইঞ্জেকশন দিল। মনে হল যন্ত্রণা কমানোর জন্য।  

মনে মনে ধন্যবাদ জানাই আমার দেশকে। যে দেশের জন্য আমার প্রাণ  উৎসর্গ করেছি, সে দেশের মাটিতে ওর জন্ম হচ্ছে। কালকে ওর হাতেই থাকবে এ দেশরক্ষার দায়িত্ব। ঠিক যেমন আমার হাতে ছিল। এখন শুধু অপেক্ষা। কয়েক মুহূর্তের নাকি কয়েক ঘণ্টার। জানি না। এরকম সময় মুহূর্ত আর ঘণ্টার মধ্যে আর পার্থক্য থাকে না। বারবার এগিয়ে যাই ওই ঘরের দিকে। আর তার পরেই আবার ফিরে আসি। পায়চারি করি।    

রাত শেষের আগেই কান্নার শব্দ এলো। আমার মেয়ে হয়েছেকি সুন্দর ফুটফুটে দেখতে। আর কি মিষ্টি সে কান্না!

 খানিকবাদে ব্রতীর  কোলে ওরা মেয়েটাকে তুলে দিল। কি সুন্দর লাগছে। এত কষ্টের মধ্যেও ওর মুখের এই হাসি। ঘেমে ওঠা মুখের উপরে চুল এসে পড়েছে। আর ওর দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি জানি ও কেন কাঁদছে। আমি জানি। এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। ওর হাতে হাত রাখতে।    

-ব্রতী আমি এসেছি। তুমি আমাকে  অনুভব করতে পারছ কি? এই তো তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। এই যে মেয়েটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।  বুঝতে পারছ না?

 মেয়েটার কি নাম দেবে? আমার চিরকালই পছন্দ ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনে যে সব মহিলারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের নাম। আর তাই শুনে তুমি আগে খুব হাসতে। বলতে সরোজিনী, অরুণা, মাতঙ্গিনী- এসব নাম আর আজকের দিনে হয় নাকি! না না, তুমি যেরকম চেয়েছিলে, নাম তাই রেখো। আমি শুধু একবার ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যাবো।

-একি তুমি এখনও কাঁদছ? আমার কথা  ভেবে! নাকি এ ভেবে যে কালকে আমার এই মেয়েকে এই সমাজে তুমি একা কিভাবে বড় করবে? কি পরিচয় দেবে? চিন্তা করো না। আমি তো আছি। তোমার পাশেই থাকব। সেই যে কি যেন সিনেমাটার নাম! আমি আর তুমি দেখতে গিয়েছিলাম। শেষ সিন। কবিগুরুর গানটা শুনে তুমি খুব কেঁদেছিলে। 'সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি। কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি। আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।' চোখ খুলে আমাকে না দেখতে পেলে, চোখ বন্ধ করবে। দেখবে, অনুভব করবে আমি আছি।তোমার পাশেই।  

আমি জানি সারা গ্রাম যখন ভীড় করে এসেছিল আমার মৃতদেহ দেখতে, তখন সে ভিড়ে তুমি ছিলে না। আমাকে যখন মৃত্যুর পরে বীরচক্র দেওয়া হল, তখনও তুমি সেখানে ছিলে না।  আসলে তোমার তো কোন পরিচয় ছিল না। কিভাবে আসবে, তাই না?

কিন্তু তাই তো আজ আমি এতদূর থেকে তোমাকে পরিচয় দিতে এসেছি। আমি ভারতের সেনা। আমি কথা রাখব না! কি করব বল! সেদিন যদি ওই সন্ত্রাসবাদীদের না আটকাতাম, ওরা হয়ত ঢুকে আসত ভারতে। আর কে বলতে পারে তোমার মত কতজন তখন তাদের স্বামী-সন্তানকে হারাত। আর প্রতি মুহূর্তে তখন তোমাদের মনে হত, তোমরাও যেন সেই সীমান্তেই পড়ে আছ। জীবন আর মৃত্যুর সীমান্তে। না, আমি তা হতে দিই নি। আমার প্রাণ দিয়ে ওদের আটকেছি। আর তোমাদের জন্য রেখে গেছি আজকের ভোর।

 ওই দেখছ ভোরের আলো আসছে! কি সুন্দর ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তোমার ওপর, তোমার চুলের উপরে, আমার সোনার উপর।  ভেবে দেখ তো কি হত যদি এই মুহূর্তে এই হাসপাতালের বাইরে বোমা বিস্ফোরণ হত! না, আমি তা হতে দিই নি।

ওই দেখো কে যেন গাইছে – আনন্দধারা বহিছে ভূবনে। দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে।  আমার জন্য ক্ষুদ্র দুঃখ থাকুক, গানের বেদনা থাকুক। তোমার জন্য রেখে গেলাম এই আনন্দধারা। 

আমি আসি। ভালো থেকো ব্রতী। প্লিজ, আর কেঁদো না।  

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

Sunday, May 31, 2020

আসল অসুখ অনেক গভীরে


আমেরিকায় আজ বিভিন্ন শহরে আগুন জ্বলছে। আমেরিকার প্রায় একশোর মতো শহরে গিয়েছি। পাঁচ-ছয় বছর থেকেছি বিভিন্ন জায়গায়। আমেরিকার সমাজে এই বিভেদ সবসময় আমার চোখে পড়েছে। সাম্প্রতিককালে সেটা আরও বেড়েছে। যে কোন ভালো কনফারেন্সে গেলে, সেখানে সিকিউরিটির লোক ছাড়া বা ট্যাক্সি চালক ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ চোখেই পড়ে না। বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জে চোখেই পড়ে না। অনেক পরিকল্পনা ও চেষ্টা সত্বেও খুব কম কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে সমাজের উপরের দিকে দেখা যায়। এটা কিন্তু শুধু বর্ণ বিদ্বেষ নয়, তাহলে সেটা ভারতীয়দের সঙ্গেও হতে পারত। এটা শিক্ষা, বুদ্ধি, সংস্কৃতি, সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানের প্রতিফলন। তার মধ্যে কোভিড পরবর্তী সমাজে বাড়তে থাকা বেকারত্ব, যার প্রভাব ওদের উপরে অনেক বেশী পড়েছে। ভারত ও ইউরোপের কিছু দেশ যেভাবে সবাইকে অনেক স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপন করে নিয়েছে, সেটাই বোধহয় আমেরিকার পক্ষে সম্ভব হয় নি। বিভেদটা তাই অনেক সময় উপর থেকে অস্পষ্ট দেখালেও, আসল অসুখ অনেক গভীরে।   

Sunday, May 24, 2020

কোভিড- ইতালি থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত


নিশ্চয়ই ভাবছেন ইতালিতে করোনা ভাইরাসে কেন এতো মৃত্যু হচ্ছে ! কারণগুলো ভাবলে বুঝতে পারবেন, ভারতেও এই একই জিনিষ হতে পারে। এর জন্য ভয়ে প্যানিক করার দরকার নেই, দরকার সতর্কতা।
দরকার সামাজিক যোগাযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে দিয়ে ঘরবন্দী হয়ে থাকা।
কতদিন? সেটা কেউ বলতে পারবে না। এটা আগামী আট সপ্তাহ হতে পারে, আবার আগামী বারো মাসও হতে পারে। যতদিন আমরা কোন ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিবডি বার না করতে পারি, ততদিন আমরা করোনার করুণার পাত্র।
এবারে ইতালিতে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর কারণগুলো দেখা যাক-
১ অত্যন্ত বেশী সংখ্যক বয়স্ক মানুষ। যারা মারা গেছেন তাদের গড় বয়স ৮১ বছর। (এটা অবশ্য ভারতীয়দের জন্য খাটে না)
২ অত্যধিক ধূমপান করার অভ্যাস(ভারতের মতো)- এটা অবশ্য ভুল প্রমাণিত। ধূমপান সংক্রমণ কমায়।
৩ দাদু -দিদা- ঠাকুরদা- ঠাকুমার সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগ।(ভারতের মতো)
৪ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অনেক পরে বুঝতে পারা।(এটা আমাদের এখনও ভারতের ক্ষেত্রে জানা নেই)
৫ প্রয়োজনের তুলনায় কম ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট(ভারতের থেকে ভালো)
৬ আড্ডার অভ্যাস।(ভারতের মতো)
৭ গায়ে হাত দিয়ে কথা বলার অভ্যাস। (ভারতের মতো)
৮ ইতালির এই এলাকায় দূষণ বেশী(ভারতের থেকে ভালো)
৯ শৃঙ্খলাবোধের ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব(ভারতের থেকে ভালো)
জার্মানি বা জাপান কিভাবে মোকাবিলা করছে, তার থেকে অনেক কিছু শেখা যেতে পারে।
এ ঘটনা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সমাজে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বকে। এ সংকট থেকে উদ্ধারের ক্ষমতা আছে শুধু বিজ্ঞানের আর মানুষের শুভবুদ্ধির।
একটা জিনিষ সবার মনে রাখা দরকার, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীরা হল আমাদের আসল ঈশ্বর। তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সেবা করছে। তাদেরকে সবার আগে রক্ষা করতে হবে। তা না হলে কেউ এ যাত্রায় রক্ষা করতে পারবে না।
অনেকেই জানে না। একবার মনে করিয়ে দিই। শেষ প্যান্ডেমিক যা প্রায় দু বছর ধরে চলেছিল, সেই ১৯১৮-২০ র স্প্যানিশ ফ্লুতে সবথেকে বেশী মারা গিয়েছিল ভারতীয়রাই। তখনকার দিনে প্রায় দেড় কোটি ভারতীয় মারা যায়।
সবাই ভালো থাকবেন। আবার বলছি ভয়ে প্যানিক করার কিছু নেই। তবে যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সত্যি অভূতপূর্ব। কিন্তু ভারতীয়রা চাইলে পারে না, এমন কিছু নেই।


Saturday, May 23, 2020

গল্প মূর্তি

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
মূর্তি

আজকে শশীর মন খুব খারাপ। আজকেও কোন মূর্তি বিক্রি হল না। উল্টে দোকান থেকে রাজীবকাকুর ধমক খেতে হয়েছে।
-রোজ কতবার করে বলব যে তোর বাবার মূর্তি বিক্রি হয় না! আগেরটা বিক্রি হলে, তবে তো আবার নতুন কিনব? বাবাকে বলিস ঘোড়ার মূর্তি তৈরি করতে বা ঠাকুর-দেবতার মূর্তি। দুর্গার- সরস্বতীর – গণেশের মূর্তি তৈরি করতে পারে। তাও কিছু কেনার লোক থাকে। আর সেটাও যদি না পারে, তো থালা বাটি গেলাস- এসব কাজের জিনিষও তো তৈরি করতে পারে! তাও যদি কোনটা বিক্রি হয়!তোর বাবা যে কি সব হাবিজাবি জিনিষ তৈরি করে, তার মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝি না। কাস্টমার কিনবে কেন? তাও তো আমি ওগুলো আমার দোকানে রাখি। নগেনের দোকানে গিয়ে দেখ। রাখবেই না।
মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলেছিল শশী – ঠিক আছে কাকু। কালকে আসব। বাবা বলে রোজ আসতে। যদি কাল বিক্রি হয়ে যায়।আর তোমার কাছে যদি বাবার তৈরি কোন মূর্তি না থাকে! যদি কেউ কিনতে এসে ফিরে যায়?
-না না, আর জ্বালাস না। আর আসবি না। দরকার হলে আমিই জানাব। যা বেরিয়ে যা।এতদিন বিক্রি হল না। কালকেই বিক্রি হয়ে যাবে!– চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিল রাজীবকাকু।
শশী আর থাকে নি। বোনের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিল। তবে বাড়ী ফিরে যায় নি। একটু দূর থেকে দোকানটার উপরে নজর রেখেছিল। যদি কেউ কিনতে আসে। রাজীবকাকুর দোকানটা বেশ বড়। শহরের মূল বাজারের মধ্যে। তাই টুরিস্টদের বড় একটা অংশ এখানে আসে। ওরা তারই উলটো দিকের রাস্তায় খানিক দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
রোদ বাড়ছে। জ্যৈষ্ঠ মাস। তেতে ওঠা রাস্তার তাপ ছেঁড়া চটির ফাঁক দিয়ে পায়ে লাগছে। খিদেও পাচ্ছে। কিন্তু আজকে ওদের একটা মূর্তি বিক্রি করতেই হবে।বাবার দুটো মূর্তি আছে দোকানটাতে। যে কোন একটা বিক্রি হলেই হল।
দূর থেকে এখনও মূর্তি দুটো দেখা যাচ্ছে। একটা ঘোড়ার উপরে দুটো বাচ্চা ওঠার চেষ্টা করছে। আর ঘোড়াটা যেন অসুস্থ। মাটির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় সাড়ে তিন ফুটের মত লম্বা ঘোড়াটা, আর উচ্চতায় প্রায় দুফুট।বাবা যখন মূর্তিটা তৈরি করছিল, তখন শশী কে ডেকে ডেকে বলতো – বুঝলি যাদের কথা আমরা বুঝি না, তাদের কথাও বোঝা যায় তাদের খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলে। কানের দিকটা লক্ষ্য কর।তাকানোটা লক্ষ্য কর। ঘাড়ের দিকটা লক্ষ্য কর। সামান্য ঢেউ খেলান ভাবটা দেখেছিস।- বলে আবার ঘোড়াটার গলার উপরে হাত বোলাত, আবার মাটির প্রলেপ দিত।
তিন ঘণ্টা বাদেও শশী দেখত, বাবা তখনও ঘোড়ার উপরেই কাজ করে যাচ্ছে।
অন্য মূর্তিটা বোঝা আরও শক্ত। তিনটে লোক তিন ধরণের পোষাকে একটা শুয়ে থাকা অসুস্থ লোককে ঘিরে বসে আছে। আর আঙুল তুলে নিজেদের মধ্যে তর্ক করে যাচ্ছে। শুয়ে থাকা লোকটা অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।
বাবার কথা মনে পড়ল শশীর- শুয়ে থাকা লোকটার মুখটা খেয়াল কর। একদিকে যন্ত্রণা ,অন্যদিকে চারদিকে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না।
-তা বাবা ওরা ডাক্তার ডাকে নি কেন?
-সব চিকিৎসায় কি আর ডাক্তার লাগে? এ হল আমাদের সমাজের ছবি। বড় হলে বুঝবি।
সত্যিই শশী বোঝে নি। শুধু এতদিনে এটুকু বুঝেছে বাবার একটা অন্য ভাষা আছে। আর সেটা সবাই বুঝতে পারে না। তাই তো বিক্রি হয় না! বাবার তৈরি দুটো মূর্তিই অন্যসব মূর্তিগুলোর থেকে এতো আলাদা, শশীরই মাঝে মধ্যে অবাক লাগে, বাবা এরকম সব অদ্ভুত ধরণের টেরাকোটার মূর্তি করে কেন। আর তাও আবার এতো কষ্ট করে। মা রোদে মূর্তি শুকোতে দিলেও বাবা ঠিক এসে বারবার দেখে যাবে, আর সময় অনুযায়ী সরিয়ে সরিয়ে রাখবে। মূর্তিটাকে নানান দিক দিয়ে দেখবে। আর বারবার ছোটছোট পরিবর্তন করবে।
শশীর চোখটা যেন একটু ঝাপসা হয়ে উঠল। পিছনের দোকান থেকে কচুরির গন্ধ আসছে। যেদিন মূর্তিটা বিক্রি হবে, এক ঠোঙা কচুরি ও কিনবেই। ওর জন্য, বোনের জন্য, সবার জন্য।
বাড়ীর ভাড়া নিতে আজকে দীপুকাকু আসবে। দীপুকাকু এমনি লোক ভালো। কিন্তু আগের দুবারেই বলে গিয়েছিল – আর ভাড়া না দিলে চলবে না।আমারও তো সংসার আছে, তাই না!
দীপুকাকু না বললেও বাবা যে আর ভাড়া না দিয়ে ও বাড়ীতে থাকবে না, তা শশী জানে। বাবার আত্মসন্মানবোধ খুব বেশী। আগের বারে ভাড়া দেওয়ার সময় বাবা খুব প্রিয় দামী পেনটা বিক্রি করে দিয়েছিল। পেনটা ঠাকুর্দার ছিল।
রোজ সকালে একবার করে পেনটা হাতে নিয়ে বাবা কাগজের উপরে কিসব লিখত খানিকক্ষণ ধরে। জিজ্ঞেস করলে বলত- এটা আমার বাবার ছিল বুঝলি। এটা দিয়েই বাবা সব কবিতা লিখত। হাত রাখলে এখনও মনে হয় বাবার আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে আছি।
তা সে পেনটাও বিক্রি করে দিতে হল। দোকান থেকে বেরিয়ে আসার পরে বাবা অনেকক্ষণ কিছু কথা বলছিল না।
শশীই তখন সান্ত্বনা দিয়েছিল। - মন খারাপ করো না বাবা, আমি বড় হয়ে ওই পেনটাই কিনে দেবো তোমায়।
বাবা কোন উত্তর দেয় নি। কিন্তু শশী কথাটা হাল্কা ভাবে বলে নি। ঠিক, কোন না কোন দিন ফিরিয়ে আনবেই পেনটাকে।
এই যে রাজীব কাকুর দোকানে বাবা আসে না, ওদের পাঠায়, তারও একই কারণ। বাবা অপমান সহ্য করতে পারে না।
তা এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ শশীর চোখ পড়ল আবার উলটো দিকের রাজীব কাকুর দোকানে ।
দোকানটাতে একটা বিদেশীদের বড় গ্রুপ ঢুকছে। ওরা যদি কেনে। কিন্তু না। বেশ খানিকক্ষণ পরে ওরা যখন বেরিয়ে এলো, তখনও শশী দেখতে পেল বাবার টেরাকোটার মূর্তি দুটো ওখানে ঠিক একই ভাবে রাখা আছে। হয়ত রাজীব কাকু ঠিকই বলে। বাবার কাজ ভালো না। তবে বাবা যে এত যত্ন নিয়ে কাজ করে, তার কি কোন দাম নেই!
বাবা যে কাজটা করে, সেটা যাতে আরও ভালো করে হয়, তা নিয়ে শশী বাবাকে একবার বলেছিল। পাশ থেকে মার বকা খেয়েছিল তার জন্য।
বাবা কিন্তু রাগে নি। মুচকি হেসে বলেছিল – বুঝলি রে পটাই, এবারেরটা একেবারে মাস্টারপিস হবে।
ওকে ওর বাবা পটাই বলে ডাকে। আদরের ডাক।
-মাস্টারপিস কি বাবা?
বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে ছিল, তার পরে বলে উঠেছিল – যেটা ঠিক বিক্রি হয়ে যাবে। আর কিছু দিনের জন্য অন্তত তোদের খাওয়া- দাওয়ার কোন অসুবিধে হবে না।
বলে আবার মূর্তি গড়ায় হাত লাগিয়েছিল বাবা।
সে কাজটা আজকেও চলছে। আরও কিছু দিন লাগবে শেষ করতে। বাড়ী ছাড়লে কি করে কাজটা শেষ হবে কে জানে?
-দাদা, বাড়ী যাবে? – রুনুর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল শশী। সকাল থেকে প্রায় না খেয়েই আছে রুনু। ওর কতই বা বয়স? সাতে পড়ল। তবু দুজনে মাঝে মধ্যে ভারী মূর্তি ধরে আনলে সুবিধে হয়, বলে ওকে নিয়ে আসা। আজকে অবশ্য মূর্তি নেই ওদের সঙ্গে। তবু রুনু কে সঙ্গে নিয়ে আসলে কিরকম যেন একটু সাহসী লাগে।
-চল, যাওয়া যাক রুনু।
-বাবাকে কি বলবে দাদা?
-কি আর বলব? বলব মূর্তি এখনও বিক্রি হয় নি। - বলেই থামল শশী।
এটা এখন কিভাবে বলা যায় ভাবতে হবে। আসলে রোজ রোজ মূর্তি বিক্রি হয় নি বলতে ভালো লাগে না শশীর। শুনলেই বাবার মুখটা কিরকম শুকিয়ে যায়। ঠিক তেমনই মারও। বাবা বোধহয় আরও বেশী আঘাত পায়, তার শিল্পকাজের কোন কদর নেই ভেবে।
তাই খুশী করতেই বাবাকে কাল মিথ্যে কথাটা বলেছিল শশী। বিক্রি হয়ে গেছে। আর দিন দুয়েকের মধ্যেই টাকাটা দিয়ে দেবে রাজীব কাকু। কিন্তু এখন ও কিভাবে আসল কথাটা বলবে যে মূর্তিটা এখনও বিক্রি হয় নি!
-বুঝলি বলে দেবো যে কিনেছিল, সেই আবার ফেরত দিয়ে গেছে। ব্যাস তাহলে ই হবে!
বলতে গিয়েই এতোটা খারাপ লাগল শশীর যে ও মুহূর্তে বুঝল এটা ও বাবাকে কোনভাবে বলতে পারবে না।
কি বলবে ভাবতে গিয়ে হঠাৎ ওর চোখ পড়ল দোকানের নতুন আগন্তুকের দিকে। বয়স্ক লোক। মুখে চোখে কিরকম যেন রাগ রাগ ভাব। ভুরু কুঁচকে তাকায়। নাকের উপরে ভারী কালো চশমা। এই লোকটা মাঝে-মধ্যেই দোকানে আসে। আর কিছু কিনেও নিয়ে যায়। কালকে ওর বাবার তৈরি মূর্তিটার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল।
একটু আশা করে পাশে এগিয়ে গিয়ে শশী বলে উঠেছিল – এটা আমার বাবার করা। নেবেন?
লোকটা কোন কথা বলে নি। চুপ করে আরও খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল মূর্তিটার সামনে। কিন্তু শেষে কেনে নি।
লোকটার গায়ে দামী পাঞ্জাবী, হাতে দামী ঘড়ি। রঙ করা চুল। পায়ে শৌখিন চটি। শশীর মনে হচ্ছিল বলে ওঠে – এটা কিনেই নিন না! কতই বা টাকার ব্যাপার আপনার কাছে। অন্তত আমরা একটা দিনের জন্য আনন্দে থাকি।
কিন্তু শেষে বলতে পারে নি।
আজকেও শশী দূর থেকে লক্ষ্য করল। লোকটা আবার বাবার তৈরি দুটো মূর্তি অনেকক্ষণ ধরে নেড়েচেড়ে রেখে দিল। নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস পড়ল শশীর।আর দেরী না করে রুনুর হাত ধরে বাড়ীর দিকে এগিয়ে গেল।
রাত বাড়ছে। হ্যারিকেনের আলোয় মূর্তি তৈরির কাজ এখনও চলছে। একটা কাঠের টেবিলের উপরে মূর্তিটা রেখে শশীর বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছে। পাশে টেবিলের উপরে টুল বক্স রাখা। তাতে ব্রাশ, ক্যালিপার, আলুমিনিয়ামের তার, স্টীলের তার, কাঠের ছুরি, একটা গোল পাথর – আরও অনেক কিছু রাখা। মূর্তি তৈরির জন্য বেশ কিছু যন্ত্র শশীর বাবা নিজের হাতেই তৈরি করেছে। আর সময় পেলেই তা নেড়েচেড়ে দেখে।
আজকের এই মূর্তিতে বেশ কিছু সেনা সারি করে যুদ্ধের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে বই। মুখে বিভ্রান্তির ছাপ। শশীর বাবা মগ্ন হয়ে সেনাদের চোখে ব্রাশ বোলাচ্ছে।
হঠাৎ বাইরে দরজায় ধাক্কার শব্দ শুনে চমকে উঠল ওরা। নির্ঘাত দীপুকাকু ভাড়া নিতে এসেছে। বাবার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আবার ধাক্কা।
আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে গেল শশীর বাবা। শশীর মা ঘরের ভিতরের দিকে রান্না করছিল। রান্না ছেড়ে শশীর মাও এগিয়ে এলো।
বাবার পিছনে পিছনে শশী এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজা খুলতেই ওরা অবাক। দীপুকাকু নয়। শশীর চেনা সকালের সেই বুড়োটা।
বুড়োটা ঘরের মধ্যে ঢুকে বাবার হাতে একটা ছোট ভিজিটিং কার্ড তুলে দিল।
বাবা কার্ডটা দেখে অবাক হয়ে বলে উঠল – রামকিঙ্কর বল! আপনার মতো এতো বড় শিল্পী আমার বাড়ীতে। কি সৌভাগ্য! আমি আপনার কাজের খুব বড় ভক্ত। বসুন বসুন।
বলে ঘরের একমাত্র অক্ষত কাঠের চেয়ারটাকে এগিয়ে দিল।
রামকিঙ্করবাবু চেয়ারে বসে বলে উঠল -বেশীক্ষণ বসব না। তোমার বাড়ী খুঁজে পেতেই অনেক সময় লেগে গেল। আবার কলকাতায় ফিরতে হবে। তা আমার সাম্প্রতিক কাজগুলো দেখেছেো?
-না, আমার তো কলকাতা অতো যাওয়া হয় না। কয়েকবছর আগে একবার আপনার কাজ দেখতে কলকাতায় একটা একজিবিশনে গিয়েছিলাম। কি অসাধারণ সব কাজ।
মুচকি হেসে উঠল রামকিঙ্করবাবু। এই প্রথম হাসতে দেখল শশী। তারপরে পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা রঙ্গীন কাগজ শশীর বাবার হাতে দিয়ে বলে উঠল- এই মূর্তিগুলো চিনতে পারছ?
কাগজটা হাতে নিয়ে চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে শশীর বাবা বলে উঠল- কি আশ্চর্য! আমিও একই ধরণের কাজ করেছি। এতো সুন্দর নয় অবশ্য।
-এ তোমারই কাজ বলতে পার!আর আমার দিক দিয়ে চুরিই বলতে পারো। আমি কয়েকবছর আগে এখানে বেড়াতে এসে প্রথম তোমার কাজ দেখি। তখন আমার ভালো সময় যাচ্ছিল না। হঠাৎ করে যেন কিছুদিন নতুন কোন কিছু ভাবতে পারছিলাম না। তোমার কাজ দেখে শুধু মুগ্ধই হই নি, ফের নতুন ভাবে সব কাজ শুরু করতে ইচ্ছে হয়েছিল। আর তখন থেকেই যখনই তুমি কোন কাজ করেছ, আমি তার থেকে আইডিয়া নিয়েছি। তোমার মূর্তি এখানে বিক্রি হয় নি, আর আমার মূর্তি কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। দুটোর মধ্যে কি তফাৎ জানো? – বলে আবার আঙ্গুল তুলে বাবার হাতে রাখা ভিজিটিং কার্ডটা দেখিয়ে বলে উঠল- ওটা। আমার পরিচয়।
-কি – কিন্তু। আমার মূর্তি তো বিক্রিই হয় না!
-এবার থেকে হবে। আমি চাই আমার সঙ্গে তোমার মূর্তিও একই একজিবিশনে থাকুক। বলতে পারো ওটাই হবে আমার গুরুদক্ষিণা।- বলে একটু থেমে ফের বলে উঠল – আগেই করতে পারতাম। কিন্তু ভয় পেতাম। মনে হত এতো অভাব আছে বলেই হয়ত এতো সুন্দর কাজ কর তুমি। তোমার মূর্তিতে এতো আবেগ, এতো গভীরতা, এতো নতুনত্ব। তাই দুটো বাচ্চা উঠতে গিয়েও রুগ্ন ঘোড়ায় উঠতে পারে না। আর ঘোড়ার সঙ্গে কোথায় যেন তুমি মিলে যাও। আমি আগে তোমাকেও জানাতে চাই নি।
- আপনি আমায় লজ্জায় ফেলছেন। আমি আপনার ছাত্র হওয়ারও যোগ্য নই। আপনার মতো শিল্পী আমার কাজের মধ্যে অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন, এটাই যথেষ্ট আমার কাছে।
-তা দেখি, এখন তুমি কোন মূর্তি তৈরি করছ?
শশীর বাবা টেবিলের দিকে দেখাতে রামকিঙ্করবাবু উঠে ওদিকে এগিয়ে গেল।
এগিয়ে এসে নতুন মূর্তিটা খানিকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখে বলে উঠল- এটাই মনে হয় আমার দেখা তোমার সেরা কাজ।ঠিকই বুঝেছিলাম। আর তাই আগের দুটো এতোদিন কিনি নি। আমি চাইছিলাম তোমার সেরা মূর্তিটা তুমি তৈরি করো। ভুল আশা করি নি। অসাধারণ। অভাব না থাকলে কি আর এরকম সৃষ্টি সম্ভব?
বলে পকেট থেকে একটা চেক এগিয়ে দিল শশীর বাবার হাতে। - কোন টাকা দিয়ে এ মূর্তি কেনা যায় না। আর আমি কিনবও না। এটা স্থান পাবে আমার সামনের একজিবিশনে। এক মাস পরে। তার মধ্যে যেন এ কাজ শেষ হয় দেখো। তুমিও যাবে। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেবো আগামি দিনের এক সেরা শিল্প প্রতিভার সঙ্গে। শুধু কিছু টাকা আগে থেকে দিয়ে গেলাম, যাতে তোমাদের কয়েক বছরের বাড়ী ভাড়া নিয়ে চিন্তা না করতে হয়!- বলে শশীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল- কি খোকা খুশী তো?
শশী ঘাড় ঘুরিয়ে আবার মূর্তিটাকে দেখল। সেনাগুলো যেন ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। যুদ্ধের ভঙ্গীতে নয়। হাসি মুখে।

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

গল্প শেষ চিঠি

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
শেষ চিঠি
আমি মাটিতে ধূলোর মধ্যে উবু হয়ে বসে অবাক হয়ে পড়ছিলাম হাতে ধরা চিঠিদুটো। একবার নয়, দুবার পড়লাম। ছবির মতো হাতের লেখা। এসব চিঠির কথাও যেমন ভুলে গিয়েছিলাম, তেমনই ভুলে গিয়েছিলাম তার প্রেরকের কথা। আজ আবার করে সব কথা মনে পড়ে গেল।
আমাদের পুরোনো বাড়ী বিক্রি হয়ে যাবে। তাই দরকারি কোন কিছু পড়ে আছে কিনা সেটাই দেখতে এসেছিলাম এই বাড়ী। প্রায় কুড়ি বছর আগে আমরা এ বাড়ী ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাই। বছরে মাঝে - মধ্যে কয়েকদিনের জন্য বড়জোর আসি। তাও গত দুবছর তা সম্ভব হয় নি। কিন্তু আমার স্কুল- কলেজের সেই দিনগুলো এখনও যেন এ বাড়ীরই জানলা-দরজার মধ্যে আটকে আছে।
শোওয়ার ঘরের কাঁচের আলমারিটা খালি করতে গিয়ে চিঠিগুলো হাতে এলো। পৌলমীর। প্রায় পঁচিশ থেকে তিরিশ বছর আগে লেখা এই সব চিঠি। একসময়ে বারবার পড়েছি। মাথার বালিশের তলায় নিয়ে শুয়েছি। আর তাই পড়া আর না পড়া চিঠিগুলো আলাদা করতে সময় লাগল না। শেষ দুটো চিঠি দেখে অবাক হলাম।ও দুটো আমার হাতে আর পৌঁছোয়নি। প্রথমবার পড়লাম। আর পৌঁছোয়নি কেন তা লেখা পড়েই বুঝতে পারলাম।
প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। আমি তখন ক্লাস নাইনে। পরীক্ষা শেষ। যাচ্ছিলাম ট্রেনে করে মালদা। আমার মাসির বাড়ী। আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ফিরে এসেছিল আমার বাবা। কথা ছিল মালদা স্টেশনে আমার মাসি আর মেসোমশাই এসে আমাকে নিয়ে যাবেন। তা ওই ট্রেনেই আমার সঙ্গে পৌলমীর প্রথম দেখা। অবশ্য দেখা হয়েছিল সেটা বলাও বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়।
ও ছিল ওর দিদি আর বাবার সঙ্গে। ওদের বাড়ী শিলিগুড়ি। সেখানেই ফিরছিল। আমার সঙ্গে ওর বাবা আর দিদিই সেদিন কথা বলছিল। শুধু শুনেছিলাম পৌলমীও আমার মতো ক্লাস নাইনে পড়ে। কিন্তু আমার আর ওর মধ্যে কয়েকবার চোখাচোখি হলেও কথা আর হয় নি। একা যাচ্ছিলাম। যদি কোন অসুবিধে হয়, তাই আমার কাছ থেকে ওর বাবা কথায় কথায় আমার কলকাতার ঠিকানা নিয়ে রেখেছিলেন।
কলকাতায় ফেরার কিছুদিন বাদে ওর প্রথম চিঠি পেলাম। বলা যায় সেই আমাদের মধ্যে প্রথম কথা শুরু। তখন ফোন সব বাড়ীতে ছিল না। আর তাই চিঠির চল ছিল। ওই চিঠির উত্তরে আমার যে চিঠি গেল সেটা ক্লাসের পড়ার বাইরে আমার লেখা প্রথম চিঠি। খুব চিন্তা হচ্ছিল যে বানান ভূলগুলো জানিয়ে হয়ত পরের চিঠিতে এর উত্তর আসবে! ফিরতি চিঠি এলো পূজোর খবর নিয়ে। নতুন জামা, বই পড়া, পুজোর ছুটিতে বেড়ানোর প্ল্যান- তার বাইরে তেমন কিছুই ছিল না তাতে।আমি আবার লিখলাম।
এভাবেই চলল চিঠির পর চিঠি। তবে আমরা জানতাম এসব চিঠি বড়দের হাত ঘুরেই হয়ত আমাদের কাছে আসবে। তাই খানিকটা বর্ণহীণ শব্দের পোষাকে সাজিয়েই আমাদের লিখতে হত। আর এসবের মধ্যে আমি আর ও দুজনেই স্কুলের গণ্ডি পেরোলাম। আমি একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলাম। আর ও শিলিগুড়ির কাছাকাছি একটা কলেজে ইংরাজি অনার্স নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল।
চিঠি থামল না। প্রতি মাসে অন্তত দুবার। আর একটু একটু করে শব্দগুলোও সাহসী হয়ে উঠল। প্রত্যেকবারই মনে হত আরেকটু লেখার জায়গা পেলে বোধহয় ভালো হত। কত কিছুই তো জানানোর আছে। নতুন কলেজ, নতুন বন্ধু, পড়াশোনার খবর, ভালো লাগার খবর। এমন কি কেউ আছে যাকে মনের সব কথা এতো সহজে খুলে লেখা যায়!
প্রত্যেকটা দিন ঠিক যেভাবে রঙ বদলে আমার কাছে ধরা দিত, ঠিক সেভাবে ওকে খবরটা না পাঠাতে পারলে মন খারাপ হয়ে যেত। আর ওরও তাই। আর তাই ওর শহরের রাস্তা, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, এমন কি ওর পছন্দের খাবার, পোশাক সবই যেন আমার চেনা হয়ে উঠেছিল। এক অচেনা শহরের মানচিত্রে শুধুই ছিল ওর নাম।
এরই মধ্যে একটা চিঠিতে জানলাম ওর বাবা অসুস্থ। ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
কেন যেন তখনও মনে হয় নি এই চিঠির বাইরেও একটা বাস্তব জগৎ আছে। আসলে ওর পরিচয়টাই বোধহয় হারিয়ে গিয়েছিল চিঠির শব্দের মধ্যে। আর তাই ওর বাবা অসুস্থ জেনেও দেখা করার কথাটা মাথায় আসে নি। আকাশ যেমন নীল হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়, ঠিক তেমন ও যেন ধরা দিয়েছিল শুধু চিঠির মধ্যেই পেনের দাগে। ঠিক সময়ে চিঠি না পেলে মনে হত যেন বড় কিছু একটা জীবন থেকে বাদ চলে গেছে।
ওর বাবার অসুস্থতার পর থেকেই ওর কাছ থেকে চিঠি আসা কমে গেল। কয়েক মাস বাদে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। আমার বেশ কিছু চিঠির উত্তর এলো না। আমিও খানিকটা অভিমানেই আর চিঠি লেখা বন্ধ করে দিলাম। পড়াশোনার চাপও ছিল। তা ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এতো চেনামুখের মধ্যে একটা প্রায় না দেখা অচেনা মুখ কোথায় যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। সময়ের পেন্টব্রাশে আবেগ হারিয়ে গেল।
আমি তখন কলেজের তৃতীয় বছরে। সেকেন্ড সেমিস্টার চলছে। সেদিন কলেজ থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। তার পরের দিন আবার পরীক্ষা। খাওয়া শেষ করে বই নিয়ে বসতে যাবো, মা একটা বিয়ের খাম বাড়িয়ে দিল- তোর জন্য বিয়ের নিমন্ত্রণের চিঠি। পৌলমীর বিয়ে।
কিরকম লেগেছিল ঠিক বলতে পারব না। শুধু মনে হয়েছিল এর পরে আর চিঠি আসবে তো! খোলা খামের মধ্যে থেকে বিয়ের কার্ডটা বার করলাম। পরের শুক্রবারে। মধ্যমগ্রামে। ওখানেই বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। যদ্দুর জানি পৌলমীর পিসি থাকত মধ্যমগ্রামে। তাই ওখানেই হয়ত অনুষ্ঠান করছে ওরা। কলেজ ফেরত মধ্যমগ্রাম পৌঁছোতে অনেক রাত হয়ে যাবে।ঠিক করলাম, তবু যাবো।
বিয়ের দিন সকাল থেকে অঝোর বৃষ্টি। নানান রাস্তায় জল জমে গেছে। তার জন্য বাস পেতে আরও দেরি হল। যখন পৌঁছোলাম অনুষ্ঠানবাড়ী, তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। কারুর সঙ্গেই বিশেষ পরিচয় নেই। তাই চুপ করে একটু দূরে গিয়ে বসলাম। শেষে পৌলমীর দিদি আমাকে চিনতে পেরে কাছে ডেকে এনে বসালো।
কাছ থেকে বিয়ের সাজে ওকে দেখলাম। ওকে খুব সুন্দর লাগছিল। কপালে চন্দনের দাগ। বড় লাল সিঁদুরের টিপ। কপালে চুল থেকে নেমে আসা সোনার টিকলি। বড় বড় চোখের পাশ দিয়ে কাজলের টান। পরণে লাল বেনারসী। কই, ও তো কোনদিন লেখে নি যে ওকে এতো সুন্দর দেখতে! হয়ত কিরকম দেখতে তা কখনও আমরা কেউ কাউকে জানানোরও প্রয়োজন বোধ করি নি। শুধু একে অন্যের চোখে চারপাশের পৃথিবীটা দেখে গেছি।
বিয়ের মন্ত্র পড়া হচ্ছে, আর তার মধ্যেই দেখলাম আমার দিকে ও বারবার তাকাচ্ছে। শেষে আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হেসে উঠল। যেন কত দিন দেখেছে।
বিয়ের কাজ শেষ হওয়ার খানিকবাদে ও এলো। আমাকে ডেকে নিয়ে পাশের একটা ঘরে গেল। প্রথমবার ওকে এতো কাছ থেকে দেখলাম। কিন্তু তাকাতেই বুঝলাম লেখা শব্দেরা কত শক্তিশালী। আর তাই ও আমার এত চেনা। ওর হাত নাড়া, দাঁড়ানোর ভঙ্গী, কথা বলা সব কিছুই যেন আমার আগে থেকে দেখা। ওর কোন কিছুই যেন আমার অজানা নয়।
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ও বলে উঠল- কি ওভাবে তাকিয়ে আছ? কিরকম লাগছে সাজটা? সেদিন তো লজ্জায় তাকাওই নি। আজকে যে খুব সাহস হয়েছে!
খুব সুন্দর। - বলতে গিয়ে নিজেই কুণ্ঠিত অনুভব করছিলাম।
ও হেসে বলে উঠল- তোমার এই সবুজ শার্টটা তোমার ছোট মামা আগের বারের পূজোতে দিয়েছিল, তাই না? খুব ভিজে গেছো। দেখো জ্বর না আসে।
-তুমি সেটা মনে রেখেছ?
ও হেসে উঠল।বলে উঠল- অনেক কিছুই তো মনে রেখেছি। আর কেউ তো আমাকে লিখবে না যে ‘জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটায় তোমার ঠোঁটের দাগ দেখতে পাই’। আর কেউ বলবে না যে ‘মনে হয় অভিমানী বৃষ্টি হয়ে তোমাকে ছুঁয়ে মাটির খোঁজ পাই’। আরও বলি সেসব কথা? সামনা সামনি তো এসব কথা কোনদিন বলতে পারতে না, তাই না?
আমার মুখটা লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠছিল।
এর মধ্যে ঘরে একজন মহিলা ঢুকলেন। দেখে মনে হল ওর পিসি। বলে উঠলেন - কি রে সবাই তোর খোঁজ করছে, চল।
-আমি এক মিনিটে আসছি পিসি। - ও একটু ভারী গলায় বলে উঠল।
ওর পিসি চলে যেতে অস্বস্তি কাটাতে বলে উঠলাম- তোমার তো হাসির গল্প সবথেকে ভালো লাগে। তাই কয়েকটা গল্পের বই নিয়ে– বলতে গিয়ে থেমে গেলাম।
হঠাৎ মনে হল ও আমার খুব কাছে চলে এসেছে। ওর নিঃশ্বাস আমার ঠোঁট ছুয়ে গেল। প্রথমবার মনে হল ওর চোখ কিছু বলতে চায়। আমার হাতটা ধরে ও বলে উঠল -তুমি আমার শেষ চিঠিগুলো পড়েছিলে?
আমি সেদিন না জেনেই পড়েছি বলেছিলাম। আর ওর চোখদুটো জলে ভরে উঠেছিল। আমার জামার হাতাটা মুঠোয় ধরে আস্তে আস্তে ছেড়ে দিয়েছিল। সামলে নিয়ে ও বলেছিল- আমি তোমার চিঠির অপেক্ষায় ছিলাম। পাই নি। বাবার মৃত্যুর পরে আর কেউ অপেক্ষা করতে রাজি ছিল না।
আজকে জানলাম সে চিঠি আমি পড়ি নি। পাঁচ বছরে যে কথা ও আমাকে বলে নি, সেটাই ও লিখেছিল শেষ দুটো চিঠিতে। আর আমার সামনে এখন সেই চিঠিদুটোই পড়ে আছে। দু যুগ বাদে কে যেন আমাকে বলে উঠছে – তোমাকেই চাই।
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী