Thursday, May 6, 2021

Review Kaushik Dam

 Koushik Dam cinema galpo

খুব ভালো লাগল
Abhijnan Roychowdhury দা এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা লেখক এবং অতি অবশ্যই এক বিরল শ্রেণির লেখক যাকে ছোটদের , কিশোর দের বা বড় দের লেখক বলে শ্রেণীভুক্ত করা যায় না।
ওঁর লেখা গুলো পড়লে কিছু না কিছু শেখা যাবেই। এই লেখায় বিজ্ঞান আর ঈশ্বর চেতনা এমনভাবে মিলে মিশে গেছে তা ভাবাই যায় না। " সামনে রোমিত বসে কাঁদছে। ..... ও সত্যি হয়তো ওদের ঈশ্বর হয়ে উঠেছিল। তাই শুনতে পাচ্ছিল।" এই লাইন গুলো যখন পড়বেন তখন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে। লেখাটা কিশোর ভারতীর 5 ই এপ্রিল সংখ্যায় ছোট গল্পের থেকে পড়লাম। এই খানেই আমার একমাত্র অভিযোগ .... আগেও বেশ কয়েকটা অনিলিখা কে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রেও আমি লক্ষ্য করেছি সেটা হল একটা উপন্যাসের পর্যায়ের লেখাকে বেশ জোর করে ছোট গল্পে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই গল্পটা একটা 200 পাতার উপন্যাস হতেই পারতো, তাতে হয়তো আরো অনেক কিছু আমরা জানতে পারতাম, শিখতাম ফিজিক্স শিখতাম বেদ মন্ত্র।

শ্রদ্ধেয় কিংবদন্তী সাহিত্যিক অনীশ দেবের আমার লেখা সম্বন্ধে কিছু কথা। সব লজিকের বাইরে।

 জানতাম না যে পত্রভারতীর থেকে প্রকাশিত ‘সব লজিকের বাইরে’ বই এর ভূমিকা লিখবেন আমার প্রিয় কিংবদন্তী লেখক অনীশ দেব।


হয়ত জানলে একটু ভয়ই পেতাম। কারণ ওঁর মতো স্পষ্টবক্তা মানুষ কোন কিছু দ্বিধা না করে যেরকম মনে হবে সেরকমই লিখবেন।

অনেকে ওঁর হাতের লেখা দেখতে চাইছেন। ওঁর মুক্তাক্ষরে লেখা এই ভূমিকাটা আমার কাছে খুব বড় ঐশ্বর্য হয়ে থাকল।

পড়লেই বুঝবেন উনি কোথায় অন্য অনেকের থেকে আলাদা। মন কতো বড় হলে কল্পবিজ্ঞানের সম্রাট এরকম ভূমিকা স্বেচ্ছায় অনুজ এক লেখক সম্বন্ধে লিখতে পারেন।



আমাদের সবার হাতে রক্ত। দায়িত্ব সবাইকে নিতে হবে।

 কয়েকজনকে দেখছি প্রধানমন্ত্রীর হাতে রক্ত দিয়ে একটা পোস্ট করছেন। এটা কী ধরণের অসভ্যতা। রক্ত তো আমাদের সবার হাতেই লেগে রয়েছে। সব দলের নেতাদের হাতে। এখন ন্যাকামি করা হচ্ছে। এখনও রাজনীতি! সত্যি আমাদের রক্ত দূষিত হয়ে গেছে রাজনীতি করে করে। এখন দেখা উচিত কীভাবে একসঙ্গে কাজ করেএই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা যায়।

কোন দলের মুখস্থ করা কিছু কথা আমার টাইমলাইনে এসে বলবেন না।

ভারতবিরোধী কথা কী বলতেই হবে! শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকা হয় । প্রধানমন্ত্রীর কী কোন দায় নেই! অবশ্যই অনেক আছে।

সব মিলিয়ে যত ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে তাতে চীন আর আমেরিকার পরেই ভারতের অবস্থান। কিন্তু আরও ১০% বেশী হয়ত দেওয়া যেত।
আমাদের কখনই ভাবা উচিত হয় নি যে সেকেন্ড ওয়েভ আর আসবে না। স্প্যানিশ ফ্লুতেও সব থেকে বেশী মানুষ মারা গিয়েছিল এই সেকেন্ড ওয়েভে। যে ক’টা দেশে মিউট্যান্ট ভাইরাস আসার সম্ভাবনা ছিল, তার মধ্যে ভারত ছিল।
কোভিড হাসপাতাল কেন আরও বেশী খোলা হয় নি।
ইলেকশান উপলক্ষে জনসমাবেশ করতে দেওয়া একদমই উচিত হয় নি।

বিভিন্ন প্রান্তে ভাইরাস সিকোয়েন্স- তাড়াতাড়ি বোঝার জন্য রিসার্চ সেন্টার আরও তাড়াতাড়ি খোলা উচিত ছিল। একই সঙ্গে এরকম B.1.617, B.1.1.7 স্ট্রেন যে এভাবে ভারতীয়দের সংক্রামিত করবে সেটাও ধারণার বাইরে ছিল।
কিন্তু কিছু রাজ্য সরকার- তারাই বা কী করেছে? সাধারণ জনতার একটা বড় অংশ তারাও কী তাদের দায়িত্ব পালন করেছে!

আমি হাজারটা জিনিস তুলে ধরতে পারি যেখানে রাজ্য সরকার শুধু অন্ধবিরোধিতার জন্য তাদের দায়িত্ব পালন করে নি! কিন্তু এখন সে সব ভুলে এসব নেগেটিভ কথায় না মেতে মানুষের সাহায্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত।

পরিবর্তন আর কিছু নির্ভীক কথা

 পরিবর্তন হয়ত এবারে আসবে।

আবার বিক্রিত পত্রিকার বিকৃত সম্পাদকীয়ের সুর বদলে যাবে। কবিতার শব্দচয়ন পাল্টে যাবে। গদ্যের ভাষা বদলে যাবে। শিকড় নতুন জমিতে গড়বে। আগাছা নতুন আলোর সন্ধানে থাকবে। সুযোগসন্ধানীরা বাসা বদলাবে। এখন একটা বড় অংশ এই রাজনীতির কুমিরডাঙ্গা খেলায় জলে আর তাই নামছে না। তারা অপেক্ষায় আছে।
আমরা চাইব সত্যিকারের পরিবর্তন যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে, শিক্ষার মানে উন্নতি হবে, শিল্প বাড়বে। দুর্নীতি, বিশৃংখলা আর অপশাসনের বদলে সুশাসন আসবে, যোগ্যতার বিচার অনুযায়ী লোকে চাকরি পাবে। যেখানে মাথার উপরে ব্রিজ ভেঙ্গে পড়বে না, লক্ষ লক্ষ লোকের টাকা চুরি যাবে না, অনুপযুক্ত লোক অন্যায়ভাবে চাকরি পাবে না, রাজনীতি ব্যাংক ব্যালান্স বাড়ানোর প্রধান উপায় হবে না।
একটা সময় আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, শ্রী বিধান চন্দ্র রায়, শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন, শ্রী অজয় মুখারজীর মতো মানুষরা যাদের কাছে রাজনীতির অর্থ ছিল আত্মত্যাগ। আমরা কখনও তো ভাবি না এঁরা কোন দলে রাজনীতি করতেন। গত চল্লিশ বছর ধরে আমরা শিল্প, শিক্ষাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে পিছিয়েছি। সে জায়গা থেকে খানিকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেব -এর মতো সৎ মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরে শিল্পের জন্য ভালো কিছু করতে চাইলেও, বাংলার মানুষ সেটা করতে দেয় নি।
রাজনীতি এখন সবথেকে নির্ভরযোগ্য পেশা, রাজনীতি একটা বড় অংশের জীবিকা শুধু সময় মতো পোশাক বদলালেই হল।
আমরা চাইব রাজনীতিতে ভালো শিক্ষিত মানুষ আসুক। শুধুমাত্র অশিক্ষিত অভিনেতা অভিনেত্রীদের ভিড়ে রাজনীতি যাত্রার মঞ্চ না হয়ে উঠুক। শুধু সুযোগসন্ধানী দুর্নীতিপরায়ণ লোকেরা রাজনীতির উঠোনে মাতামাতি না করুক।
ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে আব্বাস সিদ্দিকীর মতো নেতার মুখ দেখা যাচ্ছে যা সাম্প্রদায়িকতার অর্থ বদলে দিচ্ছে। ধর্মনিরপক্ষেতা মানে অন্ধের মতো শুধু একটা ধর্মের তোষণ নয়। সাম্প্রদায়িকতা শব্দের অর্থ এখন শুধু সুবিধেবাদী বুদ্ধিজীবীদের কাছে হিন্দুদের বিরোধিতা। অবধারিতভাবে এ রাজ্যেও ভোটে হিন্দুত্বের ঝড় আসবে যদিও সেটা অভিপ্রেত নয়।
আমরা চাইব সত্যিকারের ধর্ম নিরপেক্ষতা, যেখানে আমরা কাউকে ধর্মের পরিচয়ে দেখব না। চাইব সব জাতি ধর্মের মানুষের একই রকম বিকাশ হোক।
সঠিক পরিবর্তন কিন্তু আপনার হাতেই। আগামী প্রজন্মকে যেন আমরা ভবিষ্যৎহীন অন্ধকারের দিকে আর না ঠেলে দিই। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার সন্তান কাজের সন্ধানে রাজ্যের বাইরে যেতে বাধ্য হোক বা ব্যর্থ হয়ে ঘরের কোনে মুখ লুকোক। আমরা নিশ্চয়ই চাইব না আমাদের রাজ্য আরেকটা সিরিয়া বা আফগানিস্থান হয়ে যাক। আমরা কিন্তু সেদিকেই এগোচ্ছি। আমরা খেলা চাই না, জীবন ফিরে পেতে চাই।
পুনশ্চ
যেখানে স্বাস্থ্য পরিষেবা উধাও, অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ে কোন রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয় নি, হাসপাতালে বেড কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, কোভিড টেস্টিং করার কোন উপায় নেই, লক্ষ লক্ষ মানুষ অসহায়, সেখানে এই ফলাফল নিয়ে কাদের উৎসব করার মানসিকতা আছে, জানি না।
ভোটের ফলাফল নিয়ে এই পরিস্থিতিতে কিছু বলা উচিত নয়। তবু বলছি। কারণ গল্প শুরু করে শেষ না করলে তো আর হয় না। আর আমার গল্প কোন দাদা বা দিদি পাওয়ারে এলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
এবারে ভোটে শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের প্রতিবাদ সামনে আসে নি, শিল্পশিক্ষা বা চাকরির দাবী সামনে আসে নি।
আসলে সেটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বাঙালীর দুটো আইডেন্টিটির মধ্যে লড়াই – এ। বাঙালী – অবাঙ্গালী((বাংলা সংস্কৃতি, মনন, সুগভীর চিন্তাভাবনা, বাংলা ভাষা – সাহিত্য যার অঙ্গাঙ্গী অংশ)) ও ধর্মের ভিত্তিতে আইডেন্টিটি।
এই দ্বিতীয় আইডেন্টিটিটা তৃণমূলই তোষণের মাধ্যমে সামনে নিয়ে এসেছিল। বামপন্থী আমলে এটা আড়ালে ছিল।
কিন্তু প্রথম আইডেন্টিটা হল আসল আইডেন্টিটি, বাঙালীর পরিচয়, যা সত্যি অনন্য। যে পরিচয় যে কোন বাঙালী মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর দিয়ে গড়ে ওঠে, সেই পরিচয়। সেখানে বাঙালী সাজা যায় না। তাকে আপনার করতে যা করা দরকার, সেটা বিজেপির নেতাদের জানা ছিল না। সেখানেই তারা সফল হয় নি। এর বাইরে বেশ কিছু ভুলভাল লোক, অভিনেতা- অভিনেত্রী( সব দলেই) দলে নিয়ে এসেছিল, যারা শুধুই স্বার্থের জন্য রাজনীতিতে এসেছে। তবু বিজেপি কিন্তু অনেকটাই সফল। ৮০টা সিট পেয়ে বিরোধী থাকার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা থাকে। বিজেপি দায়িত্বশীল বিরোধীর দায়িত্ব পালন করলে, বাঙ্গালীদের সঙ্গে একাত্ম হলে পারলে, ধর্ম নিয়ে বেশী মাতামাতি না করলে, পরের বার অনেক ভালো ফল করবে। বাংলারও অনেক ভালো হবে।
আমি একই সঙ্গে আনন্দিত ও দুঃখিত(এক সময় যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় এস এফ আই -এর লীডারশিপে ছিলাম) যে বামপন্থীরা তাদের ঔদ্ধত্য, না জেনে মুখস্থ কিছু বুলি আওড়ানোর ও সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতার অভাবের উপযুক্ত জবাব পেয়েছে। শূন্য। ভাবা যায়! আর ফেরার কোন জায়গা থাকল বলে মনে হয় না।
এবার তৃণমূল প্রসঙ্গে আসি। অন্যায়ের শিকড় খুব গভীরে ছড়িয়ে পড়লে হঠাৎ করে তার পরিবর্তন হয় না। কারণ সে শিকড় তৃণমূলস্তরে ছড়িয়ে থাকে। তার পরিবর্তন আস্তে আস্তে হয়। আশা রাখি দিদি তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন। নৈরাজ্য না বাড়িয়ে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঠিক পথে এগোবেন। মানুষের বিশ্বাসের উপযুক্ত সন্মান দেবেন।

কল্পবিজ্ঞানের গল্প - ফিরে পাওয়া

ফিরে পাওয়া

অভিজ্ঞান রায় চৌধুরী


-দীপু না?
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। সৌম্য, আমার স্কুলের বন্ধু। বারো বছর একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। তিরিশ বছর বাদে দেখা। কিন্তু একি চেহারা হয়েছে ওর? গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হাড় জিরজিরে চেহারা। চোখের তলা বসা। মাথা জোড়া টাক। বয়স যেন সময়ের অনেক আগেই চোখে মুখে থাবা বসিয়েছে। একটা রংচটা সবুজ শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে অজানা বিষণ্ণতা।
জড়িয়ে ধরে বলে উঠলাম, - কী খবর? এরকম চেহারা হয়েছে কেন? কী করিস এখন?
-বলছি, একটু ফাঁকায় চল, এখানে কথা বলতে অসুবিধা হবে।
ঠিকই, এই ভিড়ের মধ্যে কথা বলা অসম্ভব। ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। এ ওর গায়ের ওপর এসে পড়ছে। যতদূর দেখা যায় শুধুই লোকের মাথা। নানান বয়সের মহিলা পুরুষ বাচ্চা –সবাই উৎসবে মেতেছে। খানিক দূরে দূরে স্টল।তাতে নানান ধরণের পানীয় রাখা। অনেক রকম ফাস্টফুডের স্টল।
প্রায় এক মাইল দূরে স্টেজ। খালি চোখে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। তবে জায়গায় জায়গায় বড় বড় ইলেকট্রনিক স্ক্রিন রাখা, তাতে স্টেজের ছবি দেখানো হচ্ছে। বেশ কয়েকজন কলাকুশলী একটা মাতাল করা গানের তালে তালে স্টেজের ওপর নাচছে। সেই একই ছন্দে নেচে চলেছে এই মাইল খানেক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা দর্শকরা।
কারো যেন কোন পরিচয় নেই, লজ্জা নেই, দ্বিধা নেই। বাঁধন ছেঁড়া আনন্দে পরিচিত- অপরিচিতের দাগ মুছে গেছে। আমি নিজেও খানিক আগে নাচছিলাম। অবশ্য এখনকার দিনে এমনিতেও চেনা অচেনা কথাটার তাৎপর্য হারিয়ে গেছে। চেনা মুখ খুব দ্রুত অচেনা হয়ে যায় - অচেনারা চেনার জায়গা নেয়।
সে যাক গে, পরিবর্তন তো আসবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। ভিড় এড়িয়ে ফাঁকা জায়গার খোঁজে সৌম্যর পিছু নিই। খানিক বাদে একটা ক্যাফের দিকে নির্দেশ করে সৌম্য। বলে ওঠে- চল, ওখানেই বসা যাক। দুটো কফির অর্ডার দে। আমার পকেট ফাঁকা।
ওর চেহারা দেখে আগেই বুঝেছিলাম, কথাতেও বুঝলাম- ওর অবস্থা খুবই খারাপ।
দু কাপ এক্সপ্রেসো নিয়ে মুখোমুখি বসলাম। বাইরের উন্মাদনা, চিৎকার, শরতের নীল আকাশ- হাল্কা সাদা নানান নক্সার মেঘের জিগস পাজল ভাঙ্গা-গড়া দেখার মধ্যে যে আনন্দ ছিল –সবটুকু হারিয়ে গেল সৌম্যর মুখের দিকে একঝলক তাকাতেই। দুঃখ-বিষণ্ণতা যে মুখে এত গভীর দাগ কাটতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।
কপালে দুই ভুরুর মধ্যে গভীর খাঁজ। আমার দিকে খানিকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে উঠল- কেমন আছিস?
-ভালো, একরকম চলে যাচ্ছে।
-কী করছিস?
-আই রোবটসের নাম শুনেছিস? আড্ডা মারার রোবট তৈরি করে। ওরই মার্কেটিং – এ আছি। ‘দুঃখের সময়- সুখের সময়- সবসময়-আপনার সঙ্গী –আই রোবট’- অ্যাডটা দেখেছিস? আমার তৈরি। বেশ একটা নাটকীয় কায়দায় বলে উঠলাম।
কিন্তু উৎসাহটা নিভিয়ে দিয়ে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল সৌম্য। কফির কাপটা মুখের কাছে এনে আওয়াজ করে একটা চুমুক দিয়ে ফের বলে উঠল –
-বাড়ি থেকে বেরোস না একদম, তাই না?
-না, তেমন দরকারই হয় না। বাড়িতে থেকেই কাজ করি। ওই, মাঝে মধ্যে রেয়ারলি বেরোই।
-তার মানে খোঁজ খবর কিছুই রাখিস না, তাই তো?
-তা কেন রাখব না? ইন্টারনেট আছে, খবরের কাগজ আছে, টিভি আছে, ফোন আছে, ভার্চুয়াল নলেজ সেন্টার আছে, নিউজ ফিড আছে- চাইলেই ঘরে বসে সারা বিশ্ব। সব খবর রাখি। তা হঠাৎ করে এমন প্রশ্ন?
মুচকি হাসল সৌম্য। হাসিতে শ্লেষ মাখানো। - বলতো আজ এখানে এত লোকের ভিড় কেন?
কেন আবার ফুটবলে ‘সোনার বাংলা’ জিতেছে বলে। এতবড় একটা টুর্ণামেণ্ট। তাই সরকার থেকেই সব আয়োজন করেছে। উফ চারদিকে যা হুল্লোড়। বিশাল অ্যাচিভমেন্ট।
একটু ব্যাঙ্গের হাসি হাসল সৌম্য। তারপর কফির কাপটা নামিয়ে আমার দিকে তাকাল- তুই না বিজ্ঞানের খুব ভাল ছাত্র ছিলি! সব লজিক হারিয়ে ফেললি নাকি?
চারদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ভৎর্সনার সুরে ফের বলে উঠল, সব ব্যাটা গাধা। চোখে ঠুলি বেঁধে বসে আছে। তুইও ওদের দলে ভিড়েছিস! আচ্ছা, তোর অবাক লাগে না? সামান্য একটা খেলা- দুটো টিমের মধ্যে – তাও আবার একই দেশের। তা নিয়ে এত হইচই! ওদিকে রোজ লক্ষ লক্ষ লোক না খেয়ে মরছে। জলের অভাবে চাষ-বাস বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তাদের খবরও রাখিনা। সব লজিক আমরা হারিয়ে ফেলেছি। কাঠের পুতুলের মতো ওদের কথায় উঠছি- বসছি- নাচছি । ওরা যা বলছে বিশ্বাস করছি।
শেষের দিকের কথাগুলো সৌম্য ফিস ফিস করে বলল। কিন্তু ও যে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে তা ওর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারছিলাম। ওর রগের শিরাগুলো দপদপ করছিল।
-ওরা মানে কারা?
-গর্ভনমেন্ট –মিডিয়া-সব একদল হয়ে আমাদের যা বোঝাচ্ছে, আমরা তাই বুঝছি। যা দেখাচ্ছে, তাই দেখছি। ওরা যদি সূর্যকে দেখিয়ে বলে চাঁদ, আমরা ভাবি তাই তো চাঁদ ই হবে।
বাকি কফিটা একচুমুকে শেষ করে সৌম্য বলে উঠল – কাল আসছিস? ময়দানে? মঙ্গলের উদ্দেশ্যে যারা রওনা হচ্ছে তাদের
জন্য হাততালি দিতে?
কথাটা যেভাবে শেষ করল সৌম্য, তাতে স্পষ্ট একটা ব্যঙ্গ ছিল।
বললাম,- ভাল মনে করেছিস। ঠিক ই তো। কালই তো রকেট লঞ্চ করা হবে শ্রীহরিকোটা থেকে। অবশ্যই থাকব।
-তাহলে কাল দেখা হবে, আজ চলি। বলে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়াল সৌম্য। ফের বলল, তোকে ট্যাগ করে রেখেছি যাতে লোকের ভিড়ে তোকে খুঁজে পেতে অসুবিধে না হয়। -বলে ওর ফোনে আমার আই ডিটা সেভ করে নিল।
এরপর যেরকম হঠাৎ করে এসেছিল, সেরকম হঠাৎ করে বেড়িয়ে গেল। কফির দাম মিটিয়ে আবার আমি ভিড়ে গিয়ে মিশলাম। সৌম্যর সঙ্গে কথা বলে মনে যেটুকু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হয়েছিল তা ভুলতে মিনিট খানেক লাগল। ড্রিঙ্কস হাতে মঞ্চের গানের তালে তালে পা ফেললাম। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলাম।
পরদিন সন্ধ্যা সাতটা। ময়দানের বেশ খানিকটা দূরে ম্যাগলেভ ট্রেনটা থামল। সেখান থেকে আধঘণ্টার হাঁটা। স্টেশন থেকেই সারি দিয়ে লোক এগিয়ে চলছে। কাউকে জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই। জনস্রোত একমুখী। ময়দানে ঢোকার আগেই আমার ফোনটা বেজে উঠল। সৌম্য। বলল, “দাঁড়া, তুই যেখানে আছিস সেখানেই থাক। খুঁজে পেয়েছি। পাঁচ মিনিটে আসছি।”
আজকাল টেকনোলজি এত এগিয়ে গেছে যে একজন আরেকজনকে খুঁজে বের করতে জিপিএস বেসড ট্রাকিংয়ের সাহায্য নেয়। আইডিটা জানা থাকলেই হল। খুঁজে বের করা জলের মতো সোজা।
চার মিনিটের মাথায় বাঁ-কাঁধের ওপর হাতটা এসে পড়তেই ঘাড় না ঘুরিয়েই বুঝলাম সৌম্য এসে গেছে।
“চল, আর তো পাঁচ মিনিটের মধ্যেই লঞ্চ।”
ওর সঙ্গে এগোলাম। এটা একটা আলাদা মজা। হাজার হাজার, ভুল বললাম, লক্ষ লক্ষ লোক বড়ো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। তাতে শ্রীহরিকোটা থেকে লাইভ ভিডিও দেখানো হচ্ছে। সবার হাতে চিপস, পপকর্ন, কোল্ড ড্রিঙ্কস। চোখে মুখে উত্তেজনা। রকেট লঞ্চের আর কয়েক মিনিট বাকি। যারা এসেছে তাদের মধ্যে ক’জন স্যাটেলাইটের অর্থ বোঝে, তাও জানি না। তবে এরকম একটা সেলিব্রেশন দেখার বিনা পয়সার মজা কে মিস করে!
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সৌম্য বলে উঠল, “কী, টেনশন হচ্ছে নাকি?”
“হ্যাঁ, তা তো একটু হবেই। ভারত থেকে মঙ্গলে ফার্স্ট টাইম একশোজন সাধারণ লোককে নিয়ে মহাকাশ ভ্রমণ। স্পেস ট্রাভেল। একটু ভুল হলেই কী হবে বল তো? আর কত খরচ!”
“ভুল হবে না। সব দেখবি সময়মতো হয়ে যাবে। ঠিক যেমন অন্য সব মিশনেও হয়। আসলে অভিযান হলে তবে তো ব্যর্থতার প্রশ্ন! সব ধাপ্পা!”
আমি সৌম্যর কথার উত্তর দিলাম না। ওর মাথার যে একটু গণ্ডগোল হয়েছে তা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে রইলাম। পুরো ময়দান জুড়ে কয়েক মিনিটের নীরবতা। দু-একটা বাচ্চার কান্না আর বায়নার শব্দ। এর মধ্যেই হঠাৎ হাততালির ঢেউ তুলে জায়ান্ট স্ক্রিনে লঞ্চ ভেহিকল ASLV-50 মাটি ছেড়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড। স্পেস-ক্র্যাফটটা ফোকাসের বাইরে হারিয়ে
যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ফুটে উঠল ‘মিশন সাকসেসফুল’।
হাত তুলে পাগলের মতো লাফাতে শুরু করলাম। ঠিক যেমন আমার আশেপাশের হাজার খানেক লোকও আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফাচ্ছে। কেউ জামা খুলে আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে, তো কেউ আনন্দে মাটিতে বসে পড়েছে। কেউ বা মদের নেশায় কী যে বলছে তার কোনও ঠিক নেই। একটা দেশাত্মবোধক গান শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ সৌম্যর দিকে চোখ পড়ল। ঠোঁটের কোণে হাসি। জিনসের দু’পকেটে হাত দিয়ে একইভাবে চারদিকের পরিবেশের মধ্যে নিতান্তই বেমানানভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অবাক চোখে ওর দিকে তাকাতেই ও বলল, “আচ্ছা, তোর একবারও মনে হয় না যে এসব সাজানো?”
“মানে?”
“পুরোটাই সাজানো। কোনওরকম লঞ্চই হয়নি। পুরো ভিডিওটাই আগে থেকে তৈরি। লোক ঠকানো!”
“কী বলছিস! তোর মাথার ঠিক আছে? এ নিয়ে একমাস ধরে এত লেখালেখি হচ্ছে। কত মিডিয়া ছিল দেখলি না লঞ্চ সাইটে? স্যাটেলাইট লঞ্চ স্টেশনের কন্ট্রোল রুমটাও দেখাচ্ছিল। কত সায়েন্টিস্ট! সব মিথ্যে?”
“হ্যাঁ, মিথ্যে। সব ধাপ্পাবাজি। আসল ইস্যু থেকে লোকের মন সরিয়ে রাখার জন্য। আচ্ছা দীপু, আজকের দিনটা তোর খেয়াল আছে? ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। আজকে পৃথিবী মঙ্গল থেকে অনেক দূরে থাকে। কখনও আজকের দিনে এই অভিযান হওয়া উচিত? আজ পাঠালে সেই স্পেস-ক্রাফট মঙ্গলে পৌঁছবে ২০২৫-এ, যেখানে এ-বছরের নভেম্বরে পাঠালে ওটা মঙ্গলে পৌঁছবে ২০২৪-এ। এই সময়ে পৃথিবী মঙ্গল থেকে সব থেকে দূরে থাকে। এসময়ে কখনও মহাকাশযাত্রা হতে পারে? অবাস্তব! যারা এটা জানে তাদের কথা বলতেও দেওয়া হয় না।”
আমি অবাক চোখে তাকালাম সৌম্যর দিকে। এ তো পাগলের প্রলাপ নয়। তবুও বললাম, “অন্য কোনও কারণও তো থাকতে পারে। আমরা তো আর এ-ব্যাপারে এক্সপার্ট নই।”
“জানি তুই এত সহজে আমার কথা মেনে নিবি না। আচ্ছা, তোকে আরেকটা জিনিস দেখাই। শ্রীহরিকোটার কারেন্ট ওয়েদার। বলে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে শ্রীহরিকোটার ওয়েদার দেখানোর চেষ্টা করল সৌম্য। আমার কাছে খবর আছে যে ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে। আর ওই স্ক্রিনে দেখলি কীরকম ঝকমকে আকাশ দেখাল?” বলে সৌম্য ফোনের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা ওয়েদার রিপোর্টটা আমায় দেখায়।
তাতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে সানি স্কাই। টেম্পারেচার ৩২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। ঠিক যেরকম দেখাচ্ছিল।
এবার চেঁচিয়ে ওঠে সৌম্য, “ওরা ওয়েদার রিপোর্টও চেঞ্জ করে দিয়েছে! কী সাংঘাতিক! মাই গড! এসব কী হচ্ছে! তুই বিশ্বাস কর দীপু, ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে।”
আমি ওর পাগলামি দেখে মুচকি মুচকি হাসছিলাম। বলে উঠলাম, “সৌম্য, তুই বাড়ি যা। এসব নিয়ে মাথা খারাপ করিস না। এসব সাজিয়ে ওদের লাভ কী! তুই মনের মধ্যে থেকে এসব নেগেটিভিটি দূর কর। সব কিছুতেই প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু লজিক্যালি ভেবে দেখ। খুব সহজ ঘটনাকে শুধু শুধু জটিল করিস না।”
এবার সৌম্যর চোখে রাগ ফুটে উঠল। “তোদের কাছে লজিক শিখতে হবে, তাই না? ওই, ওই যে লোকটা, যে সায়েন্টিস্টের অভিনয় করছিল কিছুদিন আগে সাবানের বিজ্ঞাপনে অভিনয় করত। চাপদাড়ি লাগিয়ে আর চোখের মণির কালার বদলে আমার চোখ এড়িয়ে যাবে, তাই না! এই কন্ট্রোল রুমের প্রত্যেকটা সায়েন্টিস্ট সাজানো! মাঝারি মানের অভিনেতা! বিজ্ঞানের কিছুই বোঝে না।”
আমি হেসে উঠলাম। “কেন, তোর ওদের উপরে এত রাগ কেন? চল, আমার বাড়ি চল।” বলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
ভিড় এড়িয়ে বেরোতে যাব, হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম! ঠিক রোহণের মতো দেখতে একটা ছেলে।
আকাশটা যেন একটু ধূসর হয়ে গেল। রোহণ যখন চলে যায়, তখন ওর চার বছর বয়স হয়েছিল। কোনও কথা না বলে সৌম্যর পিছু পিছু হাঁটতে থাকলাম। মিনিট কুড়ি হেঁটে চললাম। কথা নেই। চিৎকার চেঁচামেচি পিছনে ফেলে এসেছি। খানিকক্ষণ চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষে মনটা যেন হাল ছেড়ে অচেনা কোন দেশে হারিয়ে গেল। গঙ্গার ধার দিয়ে হেঁটে চলেছি। ফুরফুরে হাওয়া গায়ে এসে লাগছে। দু’দিকে সাজানো বাগান। গাছের ফাঁক দিয়ে আধফালি চাঁদ। পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। সব মিলিয়ে মাথা বেশ ফুরফুরে লাগছিল। সৌম্য গুনগুন করে গাইতে গাইতে চলেছে। কথাগুলো কানে এল। রবীন্দ্রসঙ্গীত।
দিনেকের দেখা, তিলেকের সুখ
ক্ষণিকের তরে শুধু হাসিমুখ
পলকের পরে থাকে বুক ভরে
চিরজন্মের বেদনা
ওর গানের গলা বেশ ভালো। হঠাৎ গান থামিয়ে সৌম্য জিজ্ঞেস করল, “তুই সত্যিই ভালো আছিস তো, দীপু?”
“হ্যাঁ, দিব্যি আছি। যেদিকে হাওয়া থাকে সেইদিকে কাটা ঘুড়ির মতো উড়ে যাই। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে থাকি। কোনও পিছুটান নেই।”
শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল সৌম্য। তারপর বলে উঠল, “শুধু তুই কেন, প্রায় সবাই ভালো আছে। কোনও দায়িত্ব নেই, কোনও ভাবনা নেই, খারাপ-ভালো বোধ নেই। সব খুইয়েই এখন আমরা শুধু সেই মুহূর্তের আনন্দে মেতে আছি। শেষ কবে দুঃখ পেয়েছিস, তা মনে পড়ে দীপু?”
মাথা নাড়লাম। সত্যিই মনে পড়ে না। সব সময় দিব্যি আনন্দে আছি।
“কেন জানিস? ভেবে দেখেছিস কারণটা? ওরা আমাদের কাঁদতে দেয় না। আমাদের মনও ওরা নিয়ন্ত্রণ করে। আয়নোস্ফিয়ারে বিশেষ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য পাঠানো হয়। যা ফিরে এসে ছড়িয়ে পড়ে সারা রাজ্যে। আমাদের ব্রেনে আনন্দের সঞ্চার করে। দুঃখের দিনেও তাই আমরা দুঃখ পাই না। কাঁদতে আমরা তাই ভুলে গেছি। খুব কষ্টেও মুখের হাসি মোছে না। ওরা জানে যে আমরা চারপাশের কঠিন সত্যকে ভুলে থাকলে ওরা যা ইচ্ছে তাই করে যেতে পারবে। কোনও বিদ্রোহ হবে না। কেউ প্রশ্ন তুলবে না। ওরাও নিশ্চিন্তে আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রেখে আরও অপকর্ম করে যেতে পারবে। আমিও যদি তোদের মতো হতে পারতাম!”
খানিক থেমে আবার বলল, “কিন্তু পারলাম না। এই এটার জন্য।”
পকেট থেকে ছোটো বলের মতো কিছু একটা বার করল সৌম্য। তারপর বলল, “আমার আবিষ্কার। এটা চালু থাকলে সরকারি রেডিও ওয়েভের কোনও প্রভাব পড়ে না। তুই স্বাভাবিকভাবে ভাবতে পারবি। আর তখনই সত্যি ঘটনাগুলো তোর চোখে পড়বে। অসহায় মানুষগুলোর চিৎকার কানে আসবে। নিজের ফেলে আসা স্মৃতি ফিরে এসে মনের সঙ্গে কথা বলবে।”
বলে ছোটো বলটার উপর একটা জায়গা আলতোভাবে টিপল সৌম্য। একটা সবুজ আলোর আভা বলটা থেকে বেরোতে শুরু করল। হাতে নিলাম। হাল্কা গরম। ভিতরে কিছু একটা জিনিস খুব জোরে কাঁপছে।
“চল, ওই বেঞ্চটায় বসা যাক।”
খানিকদূরে একটা বেঞ্চ ছিল। দু’জনে সেখানে গিয়ে বসলাম। আমার হাতের বলটা থেকে অদ্ভুত সবুজ আভাটা এখনও বেরুচ্ছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকলাম ওটার দিকে। গঙ্গার ধারের এই বাগানটায় একসময় রোহণকে নিয়ে নিয়মিত আসতাম। কণাও থাকত সঙ্গে। এখানকার স্লিপগুলোতে বার বার চড়ত রোহণ। গাছগুলোর মধ্যে লুকোচুরি খেলতাম ওর সঙ্গে। খানিকক্ষণ লুকোচুরি খেলার পর আমাকে খুঁজে পেলেই ছুটে এসে অভিমানী চোখে আমায় জড়িয়ে ধরত। বল নিয়ে ক্যাচ ক্যাচ খেলতাম। রোহণ বলটাকে ধরতে পারলেই পরক্ষণেই ফেলে দিয়ে হাততালি দিয়ে উঠত আনন্দে। কী সুন্দর যে ছিল সেই দিনগুলো!
তারপর এল সেই দিন! স্কুলের গাড়ির মাতাল ড্রাইভারটার কাছে আসলে কোনও লাইসেন্সও ছিল না। ঘুষ দিয়ে নকল লাইসেন্স জোগাড় করেছিল। একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা মেরেছিল গাড়িটা। তিরিশটা বাচ্চার মধ্যে শুধু পাঁচজন বেঁচেছিল। রোহণ সে পাঁচজনের মধ্যে ছিল না। সে ড্রাইভারের কোনও শাস্তি হয়নি। শুনেছিলাম তার নাকি চেনাজানার মধ্যে কোন এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিল। ব্যস, সব দোষ মাফ।
সবকিছুর সুর কেটে গেল। যেন একটা চিল এসে হঠাৎ করে ছোঁ মেরে সব-সবকিছু কেড়ে নিয়ে গেল! একটা মুহূর্ত, একটা খবর, ব্যস, তারপর সব শেষ। সময় যেন ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে গেল।
আমি মাথা নিচু করে মুখ ঢেকে বসেছিলাম বেশ খানিকক্ষণ। হাতে চোখের জলের স্পর্শ বুঝিয়ে দিল কাঁদছি। আমি এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলাম। নিজের এ কান্না আমি বহুদিন শুনিনি। মনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া কথার যেন আমি হদিশ পাইনি। মনে হল একটা মরুভূমির মধ্যে হারিয়ে গেছি। সামনে শুধু একটাই গাছ। তাতে একটাও পাতা নেই। মনে হল সে গাছ যেন আমারই মতো। বেঁচে থেকেও অস্তিত্বহীন।
চাঁদ হারানো এ সন্ধেয় যেন নিজেকে নিজের কাছে হঠাৎ করে খুঁজে পেলাম। বেদনাও যে এত আপনার হতে পারে টের পেলাম। এ স্মৃতিতেই মিশে আছে আমার পরিচয়।
সৌম্য আমার পিঠে হাত দিয়ে বলে উঠল, “মন খারাপ করিস না, দীপু। বলটা দিয়ে দে, ফেরা যাক। সূর্যাস্তের শেষ রঙ ফের দেখতে পাবি। দেখ, ওদিকে তাকিয়ে দেখ। মনে হচ্ছে যেন কোনও এক শিল্পী তুলির টানে তোর মন ভালো করার চেষ্টা করছে। বারবার রঙ বদলে বদলে আরও ভালো করে আঁকার চেষ্টা করছে। এতে কিন্তু কোনও কারসাজি নেই।”

ধর্ম শিক্ষিতের কাছে আত্মসন্মানবোধ,পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের, বিশ্বাসের জায়গা। অশিক্ষিতের কাছে অন্যকে আঘাতের অস্ত্র।

 ধর্ম শিক্ষিতের কাছে আত্মসন্মানবোধ,পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের, বিশ্বাসের জায়গা। অশিক্ষিতের কাছে অন্যকে আঘাতের অস্ত্র।

আমাদের আসল সমস্যা হল শিক্ষায়, বেকারত্বে। যাকে বলে সব সমস্যার আড়ালে থাকা 'রুট কস'। আমাদের সেই জায়গাতে গিয়েই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
কোন দল মুসলিম তোষণের পথে হেঁটে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, কোন দল কট্টর মুসলিম নেতাকে এনে তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছে, কোন দল প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদী।
সে আলোচনায় না গিয়ে শিক্ষার মান কিভাবে বাড়ানো যায়, কিভাবে সুশাসন আনা যায়, কিভাবে বেকারত্ব দূর করা যায়, কিভাবে কর্ম সংস্কৃতি ফেরানো যায়, সেটাই এ বারের বিচার্য। অন্য সব কিছু শুধু নেগেটিভ প্রচার চালিয়ে ভোট পাওয়ার অজুহাত।
কারো কারো মুখে শুনছি ‘হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা’। আচ্ছা, আপনারা কী আদৌ পড়াশোনা করেন বা সারা বিশ্বে কী হচ্ছে সে বিষয়ে কোন খবর রাখেন! কেন এই রাইট উইং বিশ্বের সব দেশে মাথাচাড়া দিচ্ছে, ,তা জানেন? সময় হলে সে বিষয়ে লিখব।
সিরিয়ার কথায় আসা যাক।সিরিয়ার এক এক জায়গার মুসলিম ধর্মের এক এক শাখা, সেটা নিয়ে গৃহযুদ্ধ দশ বছর ধরে চলছে। Alawite sect, Kurds, Islamic State, Druze tribes, Arab, এক শাখার মুসলিম সিরিয়ার মধ্যেই আরেক জায়গায় গেলে তার অবধারিত মৃত্যু হবে। এর পিছনে কিন্তু আসল কারণ ছিল ৪০ বছরের অপশাসন, অশিক্ষা, দুর্নীতি যার জন্য সেখানে মানুষে মানুষে বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল।
আজ সোমালিয়া, ইথিওপিয়া থেকে মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার প্রত্যেক দেশের সবথেকে বড় সমস্যা এই র্যাডিকাল ইসলামিক টেররিজমের। অজস্র মুসলিম টেররিস্ট গ্রুপ অপারেট করছে, তারা কখনও মেয়েদের রেপ করছে, তো কখনও বাচ্চা ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অন্তত তারা জানে তাদের প্রকৃত শত্রু কে! সেটা হল শিক্ষা। আমরা নিশ্চয়ই ভারত বা বাংলাকে সে জায়গায় নিয়ে যেতে চাই না।
সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক এর মতো দেশেও গত বছরে বারবার রায়ট হয়েছে। গত সপ্তাহে ডেনমার্ক কিভাবে মুসলিম আর কালোদের বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায় তার জন্য নতুন পলিসি এনেছে। এরকম উদার দেশেও আগামী দিনে কোন জায়গায় ৩০ শতাংশের বেশী যাতে এই কমিউনিটি থেকে লোক না থাকে তা নিশ্চিত করা হবে, যাতে সেখানে অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া না দেয়। ফ্রান্স, জার্মানি থেকে পৃথিবী জুড়েই এই একই চিত্র। র্যাডিকাল ইসলামিক টেররিজম। ও তার প্রতিক্রিয়া।
আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে প্রকৃত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে ধর্মে ধর্মে ভেদাভেদ ভোলানো যায়। এজন্যই ভালো লোকের এতে আসা উচিত। কিন্তু প্রায় সব দলেই তারাই সংখ্যালঘু। ভোট দিন তাদের, যাদের ভালো মানুষ হিসেবে আপনারা বিশ্বাস করেন, যাদের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা আছে।

Saturday, July 18, 2020

গল্প ঘটনার আঠাশ ঘণ্টা বাদে

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ঘটনার আঠাশ ঘণ্টা বাদে

ঘটনার চার ঘণ্টা পরে
আজকের সকালটা যে অন্যরকম তা বোঝার জন্য রেডিও চালাতে হয় নি নগেনের। ভোররাতের দিকে বাইরে হইচই শুনে ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। গতকাল অনেক রাত করে ফিরেছে। কলকাতার বাইরে কাজের ডিউটি ছিল। ভেবেছিল বেলা করে উঠবে। সকালের ডিউটি নেবে না। কিন্তু কপাল মন্দ। ঘুমের মধ্যেই বাইরে হইচই হচ্ছে শুনে তাড়াতাড়ি করে বাইরে এসে দাড়াল। বাইরে এসে যা দেখল, তাতে কিছুক্ষণ মুখে কোন কথা এলো না।
সবুজ, বেগুনী, নীল – নানান রঙের আলোয় রাতের আকাশ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। চারদিক দিনের মতো উজ্বল হয়ে উঠেছে। রাস্তার সব আলো নিভে গেছে। যেন কোন ম্যাজিশিয়ান আকাশের খোলা মঞ্চে ইচ্ছেমতো রঙের খেলা দেখাচ্ছে। অবাক হয়ে ও তাকিয়েছিল আকাশের দিকে। অনেকক্ষণ।
তার পর প্রায় চার ঘণ্টা কেটে গেছে। এখনও চারদিকে
লোডশেডিং। বাইরে এখনও অনেক লোক হতবাক হয়ে ঘোরাঘুরি করছে। চারদিকে ব্ল্যাকআউট। কেউই কিছু জানে না। শোনা যাচ্ছে ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে।
পাশের বাড়ীর মহিমদাদু কলতলায় দাঁড়িয়ে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে বলে বেড়াচ্ছে- বুঝলি, এ হল কলির শেষ। এতো অন্যায়, এতো অন্যায়। আর কতোদিন পৃথিবী সইবে বলো।শেষ সময় এসে গেছে। তা না হলে রাতের আকাশে ওরকম ভূতের আলোর নেত্য দেখতে হয়!
মহিমদাদুর ছেলে বেশ কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ। দুই নাতী- নাতনি আর বউমা নিয়ে এখন মহিমদাদুর কষ্টের সংসার। সেসব থেকেই রাগ বোধহয়।
কিন্তু এটা ঘটনা যে চারদিকে সবাই হতভম্ব হয়ে গেছে।
নগেনের দু – তিনজন কলেজপাস বন্ধু আছে। তারা যদি কিছু বলতে পারে। কিন্তু ফোন করতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল নগেন। নেটওয়ার্ক নেই।ফোন করা যাচ্ছে না। বাড়ী থেকে বেরিয়ে চেনাজানা কয়েকজনের ফোন থেকে ফোন করতে গিয়ে দেখল, তাদের ফোনেরও একই হাল। কারুরই ফোনে নেটওয়ার্ক নেই।
বাড়ী থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলে বাজার। আজ হাট বসার দিন। কিন্তু হাট আজ তেমন জমে নি। মাত্র কয়েকজন তরিতরকারি ,মাছ নিয়ে বসেছে। বাজারে স্থানে স্থানে জটলা। সবার মুখে একই আলোচনা। কি হয়েছে? কি ব্যাপার?
পার্টির দাদারাও ভ্যাবাচ্যাকা মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রামু এ পাড়ার এক উঠতি দাদা। সিগারেটের ধোঁয়া নগেনের মুখের উপরে ছেঁড়ে রামু বলে উঠল- নিউক্লিয়ার অ্যাটাক। চীন ভারতকে আক্রমণ করেছে। আর কি? আমি আগেই জানতাম। কিছু করতে পারলাম না এই যা আফশোষ রয়ে গেল।
- সে কি? আপনি কি করে জানলেন?
- আরে সেসব খবর আমাদের কাছে ঠিক চলে আসে। সব খবর তো আর তোদের দেওয়া যায় না। তবে এতো তাড়াতাড়ি ব্যপারটা যে ঘটবে তা আন্দাজ করতে পারি নি। বুঝলি, শেষ দিন এসে গেছে। কাল আর দেখব কিনা তাই সন্দেহ। তা পুজোর চাঁদাটা আজই দিয়ে দিস।– বলে হড়বড়িয়ে অন্যদিকে এগিয়ে গেল।
নগেনের এখনও বিয়ে হয় নি। ও একাই থাকে এই পাঁচমুড়ি গ্রামে। এখানে ও নতুন একটা ছোট বাড়ী করেছে। এই দুবছ্র হল। সত্যিই কি তবে আজ শেষ দিন?
যে মানুষটার জন্য পায়ের নিচে মাটি পাওয়া গেছে, শেষ দিনে তাকে না দেখলে কি করে হবে? আজকের দিনে সেই দেবতুল্য মানুষটা ঠিক আছেন তো? শুনেছে আগের বাড়ী ছেড়ে উনি এখন এক চব্বিশ তলার ফ্ল্যাটের উপরতলায় একা থাকেন। কোন বড় বিপদে পড়েন নি তো?
নগেন মুহূর্তে ঠিক করে ফেলল কলকাতায় যাবে সেই গৌতমবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। গাড়ী চালিয়ে যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগবে। আজকের এই গাড়ী- বাড়ী সবই ওনার জন্যই। না হলে নগেনের যে কি হত বলা মুস্কিল।
ওনার বাড়ীতে গাড়ী চালাত নগেন। বাবাকে খুব কম বয়সে হারায় নগেন। বাড়ীতে রোজগেরে অন্য কেউ না থাকায় মাত্র আঠেরো বছর বয়সে কাজে নেমে পড়তে বাধ্য হয়। গাড়ী চালানোর হাত ভালো ছিল না। সবে তখন শিখেছে। তবু গৌতমবাবু ওর অবস্থা দেখে ওকে ওনার দামী গাড়ী চালানোর ভার দেন। একই সঙ্গে ওনার এটা পছন্দ ছিল না যে নগেন পড়াশোনা না করে সারাজীবন শুধু গাড়ী চালিয়ে যাবে। এজন্য একটা ডিপ্লোমা কোর্সেও ভর্তি করে দেন। এমন কি মাইনে না কমিয়ে ডিউটির সময় অনেক কম করে দেন যাতে নগেন পড়াশোনা করার সময় পায়।
বলতেন – বুঝলি, ইচ্ছে থাকলে সব কিছুই করা যায়।
কয়েক বছর পড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে পড়াশোনা ওর আর হল না। ওর মাথায় ঢুকত না। বরঞ্চ ওই গাড়ীর কলকব্জার ব্যাপারটা ওর মাথায় সহজে ঢুকত। শেষে ঠিক করে নিজে গাড়ী কিনে ব্যবসা করবে। তাতেও গৌতমবাবু উৎসাহ দেন। ওকে প্রায় জোর করে টাকা দিয়ে সাহায্য করেন যাতে ও নিজে একটা গাড়ী কিনতে পারে।
সেই শুরু। কিছুদিন পরে রোজগার করে সে টাকা ফেরত দিতে গিয়েছিল নগেন। নেন নি গৌতমবাবু।
আজ উনি একা দক্ষিণ কলকাতার একটা ফ্ল্যাটে থাকেন। এই বিপদের দিনে যদি আজ নগেন না ছুটে যায় ওনার কাছে, তবে আর কবে যাবে?
গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নগেন।
ঘটনার আট ঘণ্টা বাদে
ভেবেছিল গাড়ীতে করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে। কয়েক মাইল যেতেই রাস্তায় ট্রাফিকজ্যামে আটকে পড়ল নগেন। সার দিয়ে গাড়ী পরপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। কি ব্যাপার বুঝতে গাড়ী থেকে নেমে একটু হেঁটে এগিয়ে গেল নগেন। মাইলের পর মাইল জুড়ে লাইন। পেট্রোল পাম্পে তেল দেওয়া নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। তাই নিয়ে কিছু দূরে রাস্তায় গণ্ডগোল বেঁধেছে। তেল নাকি আগামী কয়েক দিন পাওয়া যাবে না।
প্রায় সব দোকানেই বিশাল লাইন। একটা মুদীর দোকানের সামনে তো রীতিমত মারপিট চলছে। বাইরে বড় লাইন পড়ে গেছে। সবাই ঢুকতে চায়। বেশ কিছু দিনের জন্য খাবার কিনে রেখে দিতে চায় এ পরিস্থিতিতে। কি হবে কেউ জানে না! নানান খবর বাতাসে উড়ছে।
এখনও সর্বত্র ব্ল্যাক আউট। সব ট্রান্সফরমার নাকি পুড়ে গেছে। তাই রাস্তায় জায়গায় জায়গায় জটলা।
সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। তবু তার মধ্যে ধৈর্য ধরে ঢিকঢিক করে গাড়ী চালিয়ে এগোতে লাগল। অবশেষে এমন একটা জায়গা এল যেখানে গাড়ী আর প্রায় নো নড়নচড়ন। খবর নিয়ে জেনেছে ট্রেনও চলছে না। তাই সব প্রেশার এসে পড়েছে সড়কব্যবস্থার উপরে।
নাহ, গাড়ী নিয়ে আর যাওয়া যাবে না। হেঁটে আর কত সময়ই বা লাগবে! কুড়ি মাইল বাকি আর।
হেঁটে, তারপরে সুযোগ বুঝে বাসে ওঠা গেলে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে। গাড়ীটাকে রাস্তার ধারে রেখে হেঁটে এগিয়ে চলল নগেন।
এরকম অবস্থা আগে কখনও দেখে নি। লোকেরা যেন হঠাৎ করে কয়েক শো বছর পিছিয়ে পড়েছে। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই, খাবার নেই, জল নেই, কোথাও বিদ্যুৎ নেই।
একটা সময় গৌতমবাবুর অনেক আত্মীয়-বন্ধু ছিল। উত্তর কলকাতার বিশাল বাড়ীতে লোকেদের আনাগোনা সব সময় লেগে থাকত। কিন্তু আজ আর সে দিন নেই। স্ত্রী মারা গেছে বেশ কয়েক বছর। একটা সময় বিশাল ব্যবসা একা হাতে সামলেছেন। এখন ব্যবসার দায়িত্ব ভাইপোর হাতে ছেড়ে দিয়ে ব্যবসার থেকে দূরে সরে এসেছেন।
অন্যদিন সকালে উঠে বিছানার পাশে হাত বাড়িয়ে কিশোরী আমোনকারের বিভাস রাগের সিডিটা প্রথম চালান। বহুদিনের অভ্যাস। কিন্তু আজ মিউজিক সিস্টেমে গান চালু করতে গিয়ে বুঝলেন লোডশেডিং।
একই সঙ্গে বুঝলেন আজকের দিনটা যেন একটু অন্যরকম। একটা অন্যধরণের সবজে - বেগুনী আলো জানলা দিয়ে এসে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।
কিছুদিন আগে স্ট্রোকে ওনার শরীরের বাঁদিকটা প্রায় অচল হয়ে গিয়েছে। সাহায্য ছাড়া তাই ঘরে হাঁটাচলা করতে পারেন না। খুব জলতেষ্টা পেয়েছে। অন্য ঘরের থেকে জল আনাটাও ওনার কাছে আজ একটা অ্যাডভেঞ্ছার।
ওনার চব্বিশ ঘণ্টা দেখাশোনার জন্য দুজন নার্স আছে। প্রথমজন সকাল ছটা হলে চলে আসে। অন্য দিন দেরী করে না। আজ কিন্তু ছটা, সাড়ে ছটা বেজে গেল, তার আর দেখা নেই।অন্যদিকে বহুদিনের কাজের ফুলটাইম লোকটা গতকাল দু দিনের জন্য ছুটি নিয়েছে। খবর পেয়েছে বাড়ীতে মার শরীর খারাপ। আজ সকালে একজন নতুন লোক আসার কথা। তারও দেখা নেই। অবশ্য এখনও সময় আছে।
বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পরে অনেক কষ্ট করে হুইলচেয়ারে উঠে বসে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ড্রয়িংরুমে আধবোতল জল রাখা ছিল। খানিকটা জল খেয়ে হুইলচেয়ারে করে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এসেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
আকাশ জুড়ে এরকম আলোর খেলা উনি আগে দেখেন নি। যেন প্রকৃতি আবীরের রঙের খেলার মেতেছে। লক্ষ্য করলেন অনেক লোক নিচে খোলা জায়গায় ছোটাছুটি করছে। এতো উপর থেকে তাদের দেখা যায়, যোগাযোগ করা যায় না। এ যেন
এখনকার জীবনেরই একটা ছবি।
কিছু একটা যে বড় ধরণের দুর্ঘটনা হয়েছে, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। লোকে যেন ভীত সন্ত্রস্ত। আশেপাশের ফ্ল্যাট থেকে অনেক লোকের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু উনি এটাও জানেন এখান থেকে চেঁচালে ওনার ডাক কেউ শুনতে পাবে না। এমনিতেও এ ধরণের উচ্চবিত্ত ফ্ল্যাটগুলোতে কেউ কারুর সাহায্যের জন্য চট করে এগিয়ে আসে না।
কিন্তু উপায়? এ ফ্ল্যাট থেকে কারুর সাহায্য ছাড়া বেরোবেন কি করে? এখন যদি ওনার নার্স বা কাজের লোকটা না আসে! কেউ কলিং বেল বাজালে উনি রিমোট দিয়ে দরজা খুলে দিতে পারেন। কিন্তু কোথায় কে?
উনি সেলফোন বিশেষ ব্যবহার করেন না। তবু আজ সেলফোন থেকে চেনা-পরিচিতদের ফোন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু খেয়াল করলেন ফোন যাচ্ছে না। অবাক হয়ে দেখলেন ফোনের নেটওয়ারক নেই। ল্যান্ড ফোনটাও ডেড।আশ্চর্য। এরকম তো কখনও হওয়ার কথা নয়। ওনার মতো পৃথিবীরও কি শেষ সময় এসে উপস্থিত?
কি করবেন কিছু না বুঝে সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। চুপ করে হুইল চেয়ারে বসে থাকলেন রঙের খেলা দেখতে।
ঘটনার দশ ঘণ্টা বাদে
প্রথম দিকে ঘটনার আকস্মিকতা শ্রীজাতকে অবাক করে দিলেও, কি হয়েছে খবর পেতে শ্রীজাতর বেশী সময় লাগল না।
একটা বিশাল সোলার স্টরম বা সৌরঝড়। সেই সৌরঝড়ের সঙ্গে অস্বাভাবিক মাত্রায় করোনা মাস ইঞ্জেকশন অর্থাৎ চারজড সৌরকণিকা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢুকে পড়েছে। একই সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে মিলেমিশে খুব শক্তিশালী তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তার জন্যই পাওয়ার গ্রিডের সব ট্রান্সফরমারগুলো পুড়ে গেছে। একই সঙ্গে স্যাটেলাইটগুলো খারাপ করে দেওয়ায় টেলিফোনের নেটওয়ার্ক চলে গেছে।
মাথা তাই গরম শ্রীজাতর।কতদিন ধরে পারফেক্ট মারডারের প্ল্যান করেছিল।ভুল খবর দিয়ে বুড়োটার বিশ্বস্ত কাজের লোকটাকে গতকাল থেকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আজকের জন্য নতুন কাজের লোকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারপর গতকাল শেষ মুহূর্তে আসতে বারণ করে দেওয়া হয়েছিল। একদিনের জন্য নার্সের ব্যবস্থা না করে, ভেবেছিল আজকেই লঙ্কেশকে দিয়ে কাজটা সারবে।
লঙ্কেশের কাজটাও কিছু শক্ত নয়। এমন কি ধরা পড়ারও কোন ভয় নেই। ওর কাজ ছিল শুধু গৌতমবাবুর শোওয়ার ঘরটা রং করার। ঘরের রং করানোর কথা গৌতমবাবুই ক’দিন আগে শ্রীজাতকে বলেছিল। তারপরেই শ্রীজাতর মাথায় আইডিয়া আসে।
রংমিস্ত্রি লঙ্কেশের পক্ষেও জানা থাকার কথা নয় যে ও যে নীল রঙ ব্যবহার করবে তাতে অনেক বেশী মাত্রায় সায়ানাইড আছে। এই নীল রঙের পেন্টে এমনিতেই সায়ানাইড থাকে। এটাতে আরেকটু বেশী ছিল আর কি! এ ব্যাপারে শ্রীজাতর নিজের অভিজ্ঞতা আছে। এক সময়ে রঙ তৈরির ব্যবসা ও করেছে। একই সঙ্গে জানা আছে যে বুড়োটা সবসময় ঘরের জানলা - দরজা বন্ধ করে শোয়। দীর্ঘ দিনের অভ্যেস।
সবই ঠিক ছিল। শুধু বাড়তি সাবধানতার জন্য লঙ্কেশকে আগে থেকে জানানো হয় নি কোথায় রং করতে হবে। অ্যাড্রেসও ইচ্ছে করে আগে থেকে জানায় নি লঙ্কেশকে। কিছুদিন আগে লঙ্কেশকে দিয়ে নিজের বাড়ী রং করানোর সময় প্ল্যানটা মাথায় আসে। নিজের বাড়ীর কাজ এখনও শেষ হয় নি। কিনে আনা রঙের সঙ্গে বিশেষ মাত্রায় সায়ানাইড মিশিয়ে এই স্পেশাল রং নিজের হাতে তৈরি করেছে। সেটা লঙ্কেশের কাছে গতকাল দিয়ে এসেছে। ঘরে রং করে দরজা বন্ধ করে শুলেই ব্যাস। রং থেকে নিষ্কৃত সায়ানাইড গ্যাসে এক ঘণ্টায় কাজ সারা হয়ে যাবে।
কখন কোথায় কাজটা করতে হবে সেটা সকালবেলা ফোন করে জানানোর কথা ছিল। শুধু বলা ছিল আজকেই কাজটা সারতে হবে। আরজেন্ট। যে করে হোক আজকেই করতে হবে। অন্য কোন কাজে লঙ্কেশ যেন হাত না দেয়। কিন্তু সে জানানোর উপায় এখন আর নেই। একমাত্র উপায় গাড়ী নিয়ে লঙ্কেশের বাড়ী গিয়ে জানিয়ে আসা।
এতো দিনের প্ল্যান নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে মাথা প্রথমে বেশ গরম হয়ে গিয়েছিল।
কিছুদিন বাদে গৌতমবাবুর বন্ধু প্রশান্তবাবু ফিরে এলেই উইল পরিবর্তন হয়ে যাবে।
এই মশলাপাতি- চাল এক্সপোর্টের ব্যবসা গৌতমবাবুই শুরু করেন। গৌতমবাবু সম্পর্কে শ্রীজাতর জ্যেঠা হন। গৌতমবাবু ভাইকে অর্থাৎ শ্রীজাতর বাবাকে অর্ধেক সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। কিন্তু ওনার অংশ যদি চ্যারিটিতে দান করে দেন, তাহলে অর্ধেক সম্পত্তি শ্রীজাতর হাতছাড়া হয়ে যাবে। শ্রীজাতর পুরোটা চাই। পুরোটা।
মাথা ঠাণ্ডা করে আরেকবার ভাবল শ্রীজাত।
আচ্ছা, এ পরিস্থিতিতে সেরকম কিছু ব্যস্ততার কোন দরকার আছে কি? এমনিতেও ওই রকম একটা ফ্ল্যাটে একটা মানুষ কতক্ষণ টিঁকে থাকতে পারবে? মনে তো হয় না কাউকে সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারবে। এমনিতেও ওই কমপ্লেক্সে গৌতমবাবুর পরিচিত কেউ নেই যে ওনার কথা খেয়াল রাখবে। আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে আসবে।
ধীরে সুস্থে আজকেই না হয় অন্য যে কোন সময়ে লঙ্কেশকে দিয়ে রঙের কাজটা সারানো যাবে।কাল নার্স এসে গৌতমবাবুর মৃতদেহ আবিষ্কার করবে। এতো কিছুর মধ্যে পুলিসের পক্ষে এ বিষয়ে তদন্ত করাও সম্ভব হবে না। শেষ এরকম বড়সড় সৌর ঝড়ের ঘটনা ঘটেছিল ১৮৫৯ সালে। যাকে বলা হয় ক্যারিংটন ইভেন্ট। তখন এভাবে টেকনোলজি মানুষের ঘাড়ের উপর চেপে বসে নি।না ছিল জিপিএস, না ছিলও সেলফোন, না ছিল ইলেক্ট্রিসিটি। শুধু সেসময় টেলিগ্রাফ সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এখন শুধু একদিনে কত যে লুটপাটের ঘটনা ঘটবে তার কি কোন ইয়ত্তা আছে! পুলিস সেটা সামলাবে, না এরকম একটা আপাত দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে লোক লাগাবে। তা ছাড়া এ ভাবে অপরাধীকে ধরার জন্য যে দক্ষতা লাগে, সে দক্ষতা যে কলকাতা পুলিসের নেই – সে ব্যপারে শ্রীজাত নিশ্চিত।
আর ধরবেই বা কাকে? ওই রঙের কোম্পানীর মালিককে যার রঙে ও সায়ানাইড মিশিয়েছে। নিজের মনে হেসে উঠল শ্রীজাত।
আপাতত ওর একটাই কাজ। লঙ্কেশকে খুঁজে বার করা।
ঘটনার ১৬ ঘণ্টা বাদে
এই এতক্ষণে একটা বেলের আওয়াজ যেন পেলেন গৌতমবাবু। ঠিক শুনেছেন কি? এরকম আগেও যেন দুবার শুনেছেন। দরজার কাছে গিয়ে কাউকে দেখতে পান নি। অথচ অন্য কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই। বাইরে অনেক কষ্টে বেরিয়ে একবার দরজা খুলে গিয়ে দেখেছেন লিফট কাজ করছে না। পাশে শর্মার ফ্ল্যাট। কিন্তু সেখানেও কেউ নেই। যাবেন কোথায়?
সকাল থেকে প্রায় কিছুই খাওয়া হয় নি। তাই শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। জলতেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। কোনও কলে জল নেই।
তবু আস্তে আস্তে হুইল চেয়ার নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন- কে? কে?
- আমি নগেন। আপনার গাড়ী চালাতাম। মনে পড়ে কাকু?
ছেলেটার গলা চেনা চেনা লাগছে। আচ্ছা, নগেন। কত বছর আগে ছেলেটা গাড়ী চালাত। অনেক কষ্ট-করশত করে বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে কোন রকমে দরজা খুলে দিলেন গৌতমবাবু।
কিন্তু খুলেই পড়ে যাচ্ছিলেন। নগেন ঘরে ঢুকেই গৌতমবাবুকে জড়িয়ে ধরে কোনরকমে সামলে নিল। তারপরে ওনাকে ধরে সোফায় এনে বসাল নগেন।ও নিজেও ক্লান্ত হয়ে গেছে। লিফট কাজ করছে না। চব্বিশ তলা হেঁটে উঠেছে। তার আগে কুড়ি মাইল পথ হেঁটে এসেছে।
এ ফ্ল্যাটে আগে কখনও আসে নি নগেন। চারদিকে বৈভবের চিনহ। কিন্তু কোথায় যেন তবু শূন্যতা ছড়িয়ে আছে।
বাইরে যে কি তান্ডব চলছে, ঘরের মধ্যে থেকে তা এখনও বুঝতে পারেন নি গৌতমবাবু। সব পাম্প থেমে যাওয়ায় কোথাও পানীয় জলও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কষ্ট করে জল জোগাড় করেছে নগেন। একটা দোকান থেকে অনেক কষ্ট করে সামান্য খাবারও নিয়ে এসেছে।
অশক্ত হাতে খানিকটা জল আর খাবার খেয়ে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে তবে কথা বললেন গৌতমবাবু।
- নেহাৎই খুব খিদে পেয়েছিল, তাই খেলাম। তা না হলে খেতাম না। এতো দিন আসিস নি কেন হতভাগা?- অভিমানী গলায় বলে উঠলেন গৌতমবাবু।
মাথা নীচু করে নগেন বলে উঠল- খুব ভুল হয়ে গেছে। একদিন এসেছিলাম। কিন্তু গেট থেকে ঢুকতে দেয় নি। আপনার ফোন নাম্বার আমার কাছে ছিল না। আপনি বাড়ীতে নেই বলে জানিয়েছিল সিকিউরিটি। তাই ফিরে গিয়েছিলাম। ভয়ে আর আসি নি। এখানকার যা ব্যাপার স্যাপার।
-তা তোর গাড়ী কিরকম চলছে? রোজগার হচ্ছে?
-হ্যা, চলে যাচ্ছে। একা থাকি। ভালোই চলে যায়।
-খুব ভালো। তা তোর কোন সাহায্য লাগবে?
-না, না, আগের টাকাই তো আপনি ফেরৎ নিলেন না। আমার বেশ চলে যাচ্ছে। কোন কিছু লাগবে না।
-আমাকে একটু বাইরের বারান্দায় নিয়ে চল তো।
হুইলচেয়ার ঠেলে গৌতমবাবুকে আবার বাইরে বারান্দায় নিয়ে এল নগেন।
এখন সন্ধে হয়ে গেছে। অন্যদিনের মতো কমপ্লেক্স আজ আলোয় ঝলমল করছে না। পুরো শহরের মতো কমপ্লেক্স এখনও অন্ধকারে ঢেকে আছে।
-এরা জেনারেটর চালায় নি কেন সারাদিন জানি না!
-ওটাও শুনলাম নাকি পাওয়ার সারজে পুড়ে গেছে।
-বেশ হয়েছে। পাশে বস।
নগেন পাশে একটা চেয়ার টেনে এনে বসে।
নগেনের মাথায় হাত দিয়ে গৌতমবাবু বলে উঠলেন- বুঝলি এতো অন্ধকার না হলে আলো দেখা যায় না। তাই তো আজ তোকে আবার দেখতে পেলাম। নইলে যখন চারদিক আলোয় ঝলমল করে তখন মানুষের দেখা পাই না। - একটু থেমে ফের বলে উঠলেন- মাঝে মধ্যে এখানে আসিস। তা এরকম কতদিন চলবে কিছু শুনলি?
-কেউ এখনও কিছুই জানে না। অনেককে জিজ্ঞেস করলাম। শুনলাম সূর্য নাকি ক্ষেপে গেছে। কবে শান্ত হবে কে জানে? যতদিন সব স্বাভাবিক হচ্ছে, আমি কিন্তু আপনাকে রেখে এখান থেকে যাচ্ছি না। আপনার কাজের লোক গণেশ এখন নেই? কাউকে তো দেখলাম না!
-গতকাল দু দিনের জন্য বাড়ীতে গিয়েছিল। কাল ফিরে আসার কথা।
- আপনার শরীর কিন্তু একদম ভেঙ্গে গেছে। আগে কত ভালো স্বাস্থ্য ছিল।
কথা বলতে থাকে নগেন। গৌতমবাবু মনে মনে হাসতে থাকেন। এই প্রিয় ছেলেটাকে যখন ড্রাইভার হিসেবে পেয়েছিলেন, তখন ওর বয়স সতেরো কি আঠেরো ছিল। কিন্তু তখনই ওর মধ্যে যে নিঃস্বার্থ সরল চরিত্র দেখেছিলেন, সেটা এখনও রয়ে গেছে। এক যুগ পরেও ছেলেটার অনর্গল কথা বলার অভ্যেসটাও যায় নি। একই সঙ্গে এই কম্পিটিশন আর চালাকির যুগে যে এই বোকাসোকা ছেলেটা টিঁকে আছে, সেটা দেখে উনি নিশ্চিন্ত বোধ করলেন।
মুস্কিল হল যাদের উনি অনেক কিছু দিয়ে যেতে চান, তারাই যে কিছু চায় না। জোর করে দিতে হয়।
ঘটনার আঠাশ ঘণ্টা বাদে
মাঝ রাতে শ্রীজাত যখন ফিরল, তখন ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। সারাদিন লঙ্কেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে নি। ফোন নেটওয়ার্ক এখনও অচল। এখনও ব্ল্যাক আউট চারদিকে। পাওয়ার গ্রিডে যেরকম ক্ষতি হয়েছে, তাতে অবস্থা স্বাভাবিক হতে এখনও বেশ কিছু দিন লেগে যাবে। নেহাৎ বাড়ীতে জেনারেটর আছে, তাই বাঁচোয়া।
শ্রীজাতর উপরমহলে ভালো জানাশোনা আছে। মশলাপাতির ব্যবসা শুধু শুধু রমরমিয়ে চলছে না। ইতিমধ্যেই আগামী দু মাসের জন্য বেশ কিছু খাবার কিনে মজুত করে রেখেছে।বাইরে মার্কেটে অল রেডি বিভিন্ন দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার আউট অফ স্টক। এখন যে ক’দিন যাবে, সংকট আরও বাড়বে, শ্রীজাতর মতো লোকেদের ফায়দা আর বাড়বে। পেট্রোল ডিজেল ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে না। পাইপলাইনে এর জন্য একটা বড়োসড়ো আগুন লেগে গেছে। যে সব পাইপের মাধ্যমে এসব জ্বালানী আসত, তা নাকি তাই আসা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সব জিনিষের দাম আরও চড়চড় করে বাড়বে। পরিবহণ ব্যবস্থা প্রায় অচল।
রাস্তাতে অনেক জায়গায় গুণ্ডামি, লুঠের খবর পাওয়া গেছে।
আজ আঠেরোটা বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে সারা বিশ্বে, তার মধ্যে একটা দিল্লীতে। আসলে বিমান বন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার বেশ খানিকক্ষণ কাজ করছিল না। জাপানে, আর জার্মানিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেন চেঞ্জ করতে না পারার জন্য বেশ কয়েকটা ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। রাশিয়ায় একটা তৈল শোধনাগারে এর জন্য বড়সড় দুরঘটনায় হাজার হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে।
অবশ্য এখনও অনেক খবর পাওয়াই যায় নি। সবে আসতে শুরু করেছে। নেহাত কিছু টিভি আর রেডিও চ্যানেল এখন কাজ করতে শুরু করছে, তাই কিছু কিছু খবর এখন পাওয়া যাচ্ছে।
সবকিছুর উপরে একটা জগৎ আছে, যেখানে টাকা আর ক্ষমতা থাকলে ভয় পেতে হয় না। শ্রীজাত সেই জগতের লোক। তাই ও ঘাবড়ায় না। বরং এতে শ্রীজাতর অনেক সুবিধা। ওর নিজের ব্যবসা আগামী ক’দিনে যে ফুলে ফেঁপে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু একটাই খারাপ খবর তা হল বুড়োটা নাকি এখনও বহাল তবিয়তে আছে। এরকমই খবর পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ প্ল্যান A টা এখনও বহাল রাখতে হবে। এসব কথা ভেবেই বন্ধুদের সঙ্গে একটু বেশী মদ্যপান করে ফিরেছে শ্রীজাত।
সোজা শোওয়ার ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পারল। আজ এসি চলবে না। জেনারেটরে শুধু আলো- পাখার ব্যবস্থা আছে। পাখা চালিয়ে শুয়ে পড়ল।
চাকর এসে জানাল লঙ্কেশ নাকি বাড়ীতে খোঁজ নিতে এসেছিল। তার নাকি কি একটা দরকারী রঙের কাজ ছিল, কিন্তু সে ব্যাপারে বাবুকে নাকি সারাদিন যোগাযোগ করতে পারে নি।
এই হল ফোনহীন জগত। দুজন দুজনকে খুঁজে বেরিয়েছে সারাদিন। যোগাযোগ করতে পারে নি।
আজকের মতো কাজ সারার ভালো দিন আর ছিল না। আবার আরেকটা দিনের অপেক্ষা।
-বাবু, জানলা খুলে দেব?
-কোনদিন আমি জানলা খুলে শুই- বেরো ইডিয়ট।
আরও কি বলতে যাচ্ছিল চাকরটা। ধমক দিয়ে বার করে দিল শ্রীজাত। এটা একটা বলার সময়! রাত একটা বাজে। নেশা কেটে যাচ্ছে।
বিছানায় শোয়ার খানিকক্ষণের মধ্যে বেঁহুশ হয়ে ঘুমোতে শুরু করে দিল। রাতের দিকে মিষ্টি একটা গন্ধ পেল। অ্যালমন্ডের। ভারী হাল্কা সে গন্ধ। গভীর, আরও গভীর ঘুমে হারিয়ে গেল শ্রীজাত।
চাকরের শেষ কথাটা ওর আর শোনা হয়ে ওঠে নি। লঙ্কেশ কোথায় রঙ করতে হবে জানতে এসেছিল। এ ঘরের রং খানিকটা বাকি ছিল। বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে এ ঘরেই ওই রঙ করে বিকেলের দিকে লঙ্কেশ বেরিয়ে গেছে। কাজটা আজকেই শেষ করার কথা ছিল যে!
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
১২- ডিসেম্বর- ২০১৭